উচ্চ আদালতের স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও মোহাম্মদপুরের জনতার বাজার-১-এ তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বাজারটির উদ্যোক্তারা। শনিবার সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাগর-রুনি মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তাঁরা এ অভিযোগ করেন। উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, আদালতের আদেশের অনুলিপি ঢাকা জেলা প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়ার পরও ৩ সেপ্টেম্বর কর্মচারীদের বের করে দিয়ে বাজারের প্রধান ফটকে তালা দেওয়া হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন উদ্যোক্তা বোরহান উদ্দিন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সানোয়ারুল হকসহ অন্যান্য উদ্যোক্তারা। বোরহান উদ্দিন জানান, ২০২৫ সাল থেকে তাঁরা মোহাম্মদপুরে জনতার বাজার-১ পরিচালনা করে আসছেন। কৃষক ও উৎপাদকদের কাছ থেকে সরাসরি পণ্য সংগ্রহ করে ন্যায্য মূল্যে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানোই ছিল এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।
চুক্তির শর্তাবলি তুলে ধরে সানোয়ারুল হক জানান, ২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল ঢাকা জেলা প্রশাসনের সঙ্গে তাঁদের চুক্তি হয়, যার মেয়াদ ২০২৮ সালের ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত। চুক্তি অনুযায়ী, উদ্যোক্তারা উৎস থেকে পণ্য সংগ্রহ করে সরবরাহ করবেন এবং পণ্য বিক্রির পর ২ শতাংশ সার্ভিস চার্জ কেটে তাঁদের পাওনা পরিশোধের কথা ছিল। তবে বাজার বন্ধের চিঠিতে উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে ২ শতাংশ অর্থ জমা না দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। সানোয়ারুল হকের দাবি, এই অর্থ জমা দেওয়ার দায়িত্ব উদ্যোক্তাদের নয়, বরং পণ্য বিক্রির সময় জেলা প্রশাসনের নিয়োজিত সুপারভাইজারদেরই তা কেটে রাখার কথা ছিল।
উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, শুরুতে নীতিমালা অনুযায়ী পণ্য সংগ্রহ ও সরবরাহের দায়িত্ব তাঁদের থাকলেও, পরবর্তীতে নীতিমালা পরিবর্তন করে জেলা প্রশাসনের নিয়োগ করা কর্মচারীদের বেতনসহ অতিরিক্ত আর্থিক দায় তাঁদের ওপর চাপানো হয়। অথচ কর্মচারীদের নিয়োগ, নিয়ন্ত্রণ ও বরখাস্তের ক্ষমতা জেলা প্রশাসনের হাতেই ছিল। এছাড়া বাজার পরিচালনায় প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না পাওয়ার অভিযোগও করেছেন তাঁরা। সানোয়ারুল হক বলেন, বাজারের রাস্তা সংস্কার, সফটওয়্যার কেনা এবং কর্মচারীদের উপস্থিতি পর্যবেক্ষণের সরঞ্জাম—সবই উদ্যোক্তাদের নিজস্ব অর্থে করতে হয়েছে।
সাবেক জেলা প্রশাসক তানভীর আহমেদের বিদায়ের পর প্রশাসনের অসহযোগিতা বেড়েছে বলে অভিযোগ করেন উদ্যোক্তারা। বিশেষ করে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (উন্নয়ন ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা) মাহাবুব উল্লাহ মজুমদারের কাছে সহযোগিতা চাইতে গেলে তাঁরা আমলাতান্ত্রিক জটিলতার সম্মুখীন হতেন। এছাড়া বাজারসংলগ্ন এলাকায় গরুর হাট বসানোর দায়ও অন্যায়ভাবে তাঁদের ওপর চাপানো হয়েছে বলে তাঁরা দাবি করেন।
চুক্তি বাতিলের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন উদ্যোক্তারা। তাঁদের ভাষ্য, ১২ জুলাই চিঠি দেওয়া হলেও তাতে ৩০ জুলাইয়ের তারিখ উল্লেখ ছিল এবং ২৫ জুলাইয়ের মধ্যে হিসাবপত্র বুঝিয়ে দিতে বলা হয়েছিল। এই অসংগতিপূর্ণ প্রক্রিয়াকে তাঁরা প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে ১০ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে ১ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের দেওয়া স্থিতাবস্থা বজায় রাখা এবং ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাজারের দখল ও অবস্থান অপরিবর্তিত রাখা। এছাড়া বাজারে তালা দেওয়ার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে তদন্ত, নীতিমালা পরিবর্তনের আগে অংশীজনদের সঙ্গে পরামর্শ না করার বিষয়টি খতিয়ে দেখা এবং উদ্যোক্তাদের ওপর কর্মচারীদের বেতন-ভাতার দায় চাপানোর আইনগত ভিত্তি যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে।
পাশাপাশি জবাইখানা নির্মাণের জন্য বরাদ্দ টিআর অর্থের ব্যবহার, জনতার বাজার-১ ও ২-এর সরকারি অর্থ ব্যয় ও পরিচালন ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ অডিট এবং উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক ক্ষতির দায় নির্ধারণের দাবিও জানানো হয়েছে। তাঁরা জানান, আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত তাঁরা স্থিতাবস্থা বজায় রেখে বাজারটি পুনরায় চালু করতে চান। সাধারণ মানুষের স্বার্থে সরকারের সহযোগিতা চেয়ে তাঁরা বলেন, অভিযোগের বিষয়ে প্রমাণ উপস্থাপনের সুযোগ পেলে তাঁরা তা করতে প্রস্তুত।
উদ্যোক্তাদের এসব অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (উন্নয়ন ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা) মাহাবুব উল্লাহ মজুমদার মুঠোফোনে জানান, ঢাকা জেলা প্রশাসন হাইকোর্টের আদেশের প্রতি সম্পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল। তবে তিনি উদ্যোক্তাদের অভিযোগকে ‘মিথ্যাচার’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পরে আদালত যে সিদ্ধান্ত দেবেন, তাঁরা তা মেনে নেবেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: উদ্যোক্তারা মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়েছেন।’।