অস্কারের সঙ্গে জাপানি চলচ্চিত্রের সম্পর্ক সাত দশকেরও বেশি সময়ের। আকিরা কুরোসাওয়া থেকে শুরু করে রিউসুকে হামাগুচি—কয়েক প্রজন্মের মেধাবী নির্মাতাদের হাত ধরে এই সম্পর্ক আজ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। এই বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করতে এবার পুরস্কারের গণ্ডি পেরিয়ে চলচ্চিত্রবিষয়ক আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পথে হাঁটছে অ্যাকাডেমি অব মোশন পিকচার আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেস। আগামী ২৬ অক্টোবর থেকে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত আয়োজিত ৩৯তম টোকিও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রতিষ্ঠানটির বিশেষ কর্মসূচি ‘অ্যাকাডেমি ইন টোকিও’তে অংশ নেবেন অস্কারের নীতিনির্ধারকেরা। মূলত অস্কারের নেপথ্যের গল্প, আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎ এবং নতুন প্রতিভা বিকাশের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনার লক্ষ্যেই এই বিশেষ আয়োজন সাজানো হয়েছে। চলচ্চিত্র প্রযোজনায় দুই দশকের বেশি অভিজ্ঞতা রয়েছে লিনেট হাওয়েল টেইলরের। তাঁর কাজের তালিকায় আছে ‘আ স্টার ইজ বর্ন’, ‘ক্যাপটেন ফ্যান্টাস্টিক’ ও ‘ব্লু ভ্যালেন্টাইন’-এর মতো আলোচিত চলচ্চিত্র। অস্কারের মতো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির চলচ্চিত্রকে বিশ্বের আরও বেশি দর্শকের কাছে পৌঁছে দেয়। একটি মনোনয়নও কোনো ছবির প্রতি নতুন করে আগ্রহ তৈরি করতে পারে।
আয়োজনের কেন্দ্রে থাকছেন অ্যাকাডেমির তিন শীর্ষ কর্মকর্তা—প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বিল ক্রেমার, প্রেসিডেন্ট লিনেট হাওয়েল টেইলর এবং চিফ মেম্বারশিপ, ইমপ্যাক্ট অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি অফিসার মেরেডিথ শিয়া। বিল ক্রেমার ২০২২ সাল থেকে এই পদে দায়িত্ব পালন করছেন। অস্কার আয়োজনের পাশাপাশি তিনি অ্যাকাডেমি ফাউন্ডেশন এবং প্রায় ১১ হাজার সদস্যসহ সংস্থার সামগ্রিক কার্যক্রম তত্ত্বাবধান করেন। তাঁর সঙ্গে যোগ দিচ্ছেন লিনেট হাওয়েল টেইলর, যিনি ২০২০ সালে ৯২তম অস্কার অনুষ্ঠান প্রযোজনা করেছিলেন। এছাড়াও মেরেডিথ শিয়া অ্যাকাডেমির সদস্যপদ, পুরস্কারের প্রশাসনিক কাজ এবং আন্তর্জাতিক কৌশলগত সম্পর্কগুলো দেখভাল করেন। এরপর তেইনোসুকে কিনুগাসার ‘গেট অব হেল’ ১৯৫৫ সালে এবং হিরোশি ইনাগাকির ‘সামুরাই আই: মুসাশি মিয়ামোতো’ ১৯৫৬ সালে একই স্বীকৃতি অর্জন করে।
জাপানি চলচ্চিত্রের দীর্ঘ অস্কার-ঐতিহ্যকে সম্মান জানাতেই টোকিওতে এই নেতৃত্বের সফর। ১৯৫২ সালে আকিরা কুরোসাওয়ার ‘রাশোমন’ সম্মানসূচক বিদেশি ভাষার পুরস্কার পাওয়ার পর থেকে জাপানি সিনেমা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছে। পরবর্তীতে হায়াও মিয়াজাকির ‘স্পিরিটেড অ্যাওয়ে’ (২০০৩), ইয়োজিরো তাকিতার ‘ডিপারচার্স’ (২০০৯) এবং সাম্প্রতিক সময়ে রিউসুকে হামাগুচির ‘ড্রাইভ মাই কার’ (২০২২) অস্কার জিতে সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। এমনকি ২০২৪ সালেও ‘দ্য বয় অ্যান্ড দ্য হেরন’ সেরা অ্যানিমেটেড ফিচার এবং ‘গডজিলা মাইনাস ওয়ান’ ভিজ্যুয়াল ইফেক্টসের অস্কার পেয়ে জাপানের জয়যাত্রা অব্যাহত রেখেছে। সাফল্যের এই ধারা অব্যাহত থাকে ২০২৪ সালেও। এসব অর্জনের গুরুত্ব শুধু পুরস্কার জয়ে সীমাবদ্ধ নয়।
উৎসবের মূল আকর্ষণ হিসেবে ২৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হবে ‘অ্যাকাডেমি ইন টোকিও’র বিশেষ প্যানেল আলোচনা। এতে টোকিও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের পরিচালক তাকেও হিসামাৎসুর সঙ্গে আলাপচারিতায় অংশ নেবেন অ্যাকাডেমির তিন কর্মকর্তা। বিল ক্রেমারের এটি প্রথম এশিয়া সফর হওয়ায় এ আয়োজনকে কেন্দ্র করে বিশেষ গুরুত্ব তৈরি হয়েছে। প্যানেল আলোচনা শেষে তাঁকে ‘গ্লোবাল সিনেমা লিডারশিপ স্পেশাল অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করা হবে। একই দিনে আয়োজিত হবে ‘মেম্বার গ্যাদারিং’ শীর্ষক সংবর্ধনা অনুষ্ঠান, যেখানে বিভিন্ন দেশের অস্কার সদস্যরা নিজেদের মধ্যে মতবিনিময় করবেন। অনুষ্ঠানে অ্যাকাডেমি মিউজিয়ামের পরিচালক অ্যামি হোমা, জেনি গ্যালান্টে এবং জেনিফার ডেভিডসনও উপস্থিত থাকবেন। এশিয়ার চলচ্চিত্রাঙ্গনের সঙ্গে অ্যাকাডেমির সম্পর্ক আরও জোরদার করার সুযোগও তৈরি হবে এর মধ্য দিয়ে।
পরদিন, ২৯ অক্টোবর, চলচ্চিত্রশিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় অংশ নেবেন বিল ক্রেমার। এতে জাপানের শীর্ষস্থানীয় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান তোহো কোম্পানি লিমিটেডের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিরো মাৎসুওকার মুখোমুখি হবেন তিনি। আলোচনার মূল উপজীব্য হবে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের প্রভাব, প্রেক্ষাগৃহে চলচ্চিত্র প্রদর্শনের বদলে যাওয়া বাস্তবতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নতুন সুযোগ। বিশ্বব্যাপী চলচ্চিত্র নির্মাণের ধরন দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে, আর এই পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর যৌথ প্রয়াস নিয়ে তারা বিশদ আলোচনা করবেন।
টোকিও মিডটাউন হিবিয়া হলে অনুষ্ঠেয় এই সিরিজ অনুষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে অ্যাকাডেমি কেবল তাদের বৈশ্বিক কার্যক্রমের জানান দিচ্ছে না, বরং নতুন প্রতিভা ও চলচ্চিত্রবাজারের পরিবর্তনের সাথে একাত্ম হওয়ার বার্তাও দিচ্ছে। জাপানের চলচ্চিত্রশিল্পের ঐতিহ্য, অ্যাকাডেমির নেতৃত্ব এবং বর্তমান বাজারের চাহিদাকে একসূত্রে গাঁথছে এই উদ্যোগ। ফলে টোকিও চলচ্চিত্র উৎসব এখন কেবল চলচ্চিত্র প্রদর্শনের মঞ্চ নয়, বরং বিশ্ব চলচ্চিত্রের আগামী দিনের রূপরেখা তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।