প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচিত খাতে জাপানি কোম্পানিগুলোকে বিনিয়োগের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। টোকিওতে জেট্রো হলে আয়োজিত বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরাম সংলাপে তিনি এই আহ্বান জানান। দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও গভীর অংশীদারত্বে রূপান্তরের ওপর জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন সময় এসেছে দুদেশের সম্পর্ককে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের মাধ্যমে উচ্চতর পর্যায়ে উন্নীত করার। তিনি বলেন, ‘পারস্পরিক স্বার্থ ও সুবিধার ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ সহযোগিতা এবং ব্যবসায়িক সুযোগ সৃষ্টির জন্য আমি জাপানি কোম্পানিগুলোকে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ খাত বিবেচনা করার অনুরোধ জানাচ্ছি।’। ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ ১০টি ভোক্তা অর্থনীতির একটি হয়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ তার মহাকাশবিষয়ক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করতে চায়। তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের উদ্বেগের কথা শুনেছি। জাপানি কোম্পানিগুলো দেশে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে বিনিয়োগের সুযোগ অনুসন্ধান করতে পারে। সুমিতোমো করপোরেশন জাপানি মানদণ্ড অনুসরণ করে এ অর্থনৈতিক অঞ্চলটি গড়ে তুলছে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমি পুরোপুরি বুঝতে পারি, ব্যবসা পরিচালনার জন্য নিশ্চয়তা প্রয়োজন। বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতায় জাপান বৈদেশিক বাণিজ্য সংস্থা (জেট্রো) ও জাপান-বাংলাদেশ বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা কমিটির (জেবিসিসিইসি) যৌথ আয়োজনে এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।
বিনিয়োগের জন্য চিহ্নিত অগ্রাধিকার খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে মোটরযান উৎপাদন, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও মহাকাশ গবেষণা, আধুনিক রেলপথ ও সরবরাহ ব্যবস্থা এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও উৎপাদনশিল্প।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৩৫০টি জাপানি কোম্পানির সক্রিয় কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করে জানান, জাপানের প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের পরিমাণ এখনো ৫০ কোটি মার্কিন ডলারের কম। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ আমি আগামী ৩০ থেকে ৫০ বছরের অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতা নিয়ে কথা বলতে চাই। এ ছাড়া, ওয়াইকেকে কপোরেশনের গ্লোবাল সেলস হেডকোয়ার্টার্সের ভাইস প্রেসিডেন্ট রেইসুকে আরাতানি বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক কার্যক্রমের অগ্রযাত্রা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা তুলে ধরেন।
সর্বশেষ অর্থবছরে জাপানে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ছিল ১৩৬ কোটি ডলার এবং বিপরীতে জাপান থেকে আমদানি হয়েছে ২১৬ কোটি ডলারের পণ্য। এ সময় তিনি ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানকারী প্রথম দেশগুলোর মধ্যে জাপানের ভূমিকা এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সফর ও সম্পর্কের গভীরতা স্মরণ করেন।
চলতি বছরে স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ ও জাপানের প্রথম অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ)-এর কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী জানান, এর আওতায় বাংলাদেশের ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্য জাপানের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। অন্যদিকে, ইস্পাত, মোটরযানের যন্ত্রাংশ ও ইলেকট্রনিক উপাদানসহ জাপানি পণ্য বাংলাদেশে অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা পাবে।
তিনি বলেন, ১৮ কোটির বেশি মানুষের বিশাল বাজার, ২৭ বছরের তরুণ শ্রমশক্তি এবং ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
টয়োটা মোটরস চলতি মাসের শুরুতে বাংলাদেশে কারখানা স্থাপনের যে পরিকল্পনা নিয়েছে, তাকে সরকার সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দেয় এবং ২০২৯ সালের মধ্যে পূর্ণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
জ্বালানি খাতের উন্নয়নের জন্য তিনি এলএনজি অবকাঠামো, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সামগ্রিক জ্বালানি খাতের উন্নয়নে বাংলাদেশের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশ-জাপান প্রযুক্তি পার্ক প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা এবং মহাকাশ গবেষণায় যৌথ সহযোগিতার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি। এ ক্ষেত্রে মহাকাশবিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও স্যাটেলাইট প্রকৌশলে জাপানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দেশটির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পারস্পরিক লাভজনক সহযোগিতার সুযোগ অনুসন্ধানে বাংলাদেশ আগ্রহী। পরে দেশে ফিরে তাঁরা অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগান।
এছাড়া আড়াইহাজারে সুমিতোমো করপোরেশনের মাধ্যমে পরিচালিত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের জন্য জাপানিদের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ সম্পর্কে তিনি জানান, সরকার নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে নিরলস কাজ করছে। এসব সমস্যার সমাধান এবং আরও ভালো ফলাফল নিশ্চিত করতে কাজ করছি।’। এই দুটো নিশ্চিত করার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করাই আমাদের দায়িত্ব।’।
জনশক্তির দক্ষতা উন্নয়নের বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা জাপানি ভাষা ও কারিগরি দক্ষতা অর্জনে আগ্রহী। সরকারের লক্ষ্য হলো লাখ লাখ তরুণকে জাপানি ভাষায় দক্ষ করে তোলা, যা উভয় দেশের কর্মসংস্থানের চাহিদা পূরণে সহায়ক হবে। প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদও অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের উচ্চ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাময় খাতগুলো নিয়ে বক্তব্য রাখেন। এতে জাপানি কোম্পানি, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিনিয়োগকারীদের সম্পৃক্ততায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস ও ইলেকট্রনিকস উৎপাদনকেন্দ্রিক একটি উদ্ভাবনমুখী তথ্যপ্রযুক্তি পার্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে। রেলপথ ও সরবরাহব্যবস্থাকে আরেকটি অগ্রাধিকার খাত হিসেবে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশালসহ দেশের প্রধান শহরগুলোকে সংযুক্ত করে দেশব্যাপী উড়ালপথে উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার প। এ উদ্যোগের জন্য জাতীয় রেল নেটওয়ার্কের মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন, যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের চাহিদা বিশ্লেষণ, রুটের অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর কারিগরি ও বিনিয়োগ স। মিৎসুই অ্যান্ড কোম্পানি (এশিয়া প্যাসিফিক) প্রাইভেট লিমিটেডের ঢাকা শাখার শাখা মহাব্যবস্থাপক ও কান্ট্রি চেয়ারপারসন কেনিচিরো কাওয়ামোতো ‘টুগেদার ফর আ ব্রাইটার বাংলাদেশ’ শীর্ষক উপস্থাপনা দেন।