রাজধানীর মাদক কারবারে শিশুদের ভয়াবহ রকমের সম্পৃক্ততা নিয়ে নতুন তথ্য পাওয়া গেছে। আন্তর্জাতিক সাময়িকী পিএলওএস ওয়ানে গত ১০ আগস্ট ‘আনভেইলিং প্যাটার্নস অ্যান্ড সোশিওডেমোগ্রাফিক ক্যারেক্টারিস্টিকস অব ড্রাগ ট্রাফিকিং ইন ঢাকা সিটি, বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। এতে দেখা গেছে, ঢাকা শহরে মাদক কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের মধ্যে ১৫ বছর বা তার চেয়ে কম বয়সীদের হার ২৭ দশমিক ৪ শতাংশ। গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব বার্মিংহাম ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ড. শাফায়াত হোসেন। গবেষক দলে আরও ছিলেন গ্যারেথ জে হল্যান্ডস, মো. আলামিন, মো. রোকনুজ্জামান, মাহদী হাসান এবং সামিয়া আক্তার। তাঁর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের এভিডেন্স ফর পলিসি অ্যান্ড প্র্যাকটিস ইনফরমেশন সেন্টারের গবেষক গ্যারেথ জে হল্যান্ডস, সৌদি আরবের ইমাম মোহাম্মদ ইবনে সৌদ ইসলামিক ইউনিভার্সিটির মো. আলামিন, চীনের চাংঝু ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মো।
গবেষণাটি পরিচালনার জন্য ২০২৩ সালের ২৩ এপ্রিল থেকে ২০২৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ঢাকা শহরের মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এক হাজার ১৬ জনের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। এই অংশগ্রহণকারীদের গড় বয়স ২৬ দশমিক ৭ বছর। তাদের ৫৫ দশমিক ৭ শতাংশ প্রাথমিক শিক্ষা পর্যন্ত বা তার নিচে শিক্ষিত। প্রায় ২৯ শতাংশ ফুটপাতে ও ১০ শতাংশ ভাসমান বা গৃহহীন জীবন যাপন করেন। নারী অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে এক-চতুর্থাংশ যৌন পেশায় যুক্ত থাকার কথা জানিয়েছেন। গবেষণায় ‘পারপাসিভ’ ও ‘স্নোবল স্যাম্পলিং’ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে, তাই এটি সামগ্রিক পরিসংখ্যান নয়, বরং মাঠপর্যায়ের বাস্তবচিত্র তুলে ধরেছে। তাদের ৫৫ দশমিক ৭ শতাংশের শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত বা এর নিচে। অর্থাৎ অংশগ্রহণকারীদের এলোমেলোভাবে নির্বাচন করা হয়নি। এ কারণে গবেষকরা নিজেরাই সতর্ক করেছেন, এই গবেষণার ফলাফলকে পুরো ঢাকা শহরের মাদক বিক্রেতাদের প্রতিনিধিত্বকারী পরিসংখ্যান হিসেবে ব্যাখ্যা করা যাবে না।
শিশুদের মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ার প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে চরম কর্মসংস্থানের অভাব। ড. শাফায়াত হোসেন জানান, ১৫ বছরের কম বয়সীদের এই উচ্চ হার অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মাদক সিন্ডিকেটগুলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতে কৌশল হিসেবে শিশুদের ব্যবহার করছে। নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে অনেক সময় জবরদস্তির মাধ্যমে এই অপরাধে যুক্ত করা হয়। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে দারিদ্র্য, আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং অর্থনৈতিক সুযোগের অভাবই মাদক বাণিজ্যে জড়ানোর মূল অনুঘটক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
মাদক বিক্রির ধরন ও এলাকাভেদেও ভিন্নতা দেখা গেছে। গবেষণায় ইয়াবা বিক্রিতে ১৫ বছর বা তার কম বয়সীদের আধিক্য সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে, পাশাপাশি হেরোইন বিক্রিতেও তাদের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ রয়েছে। গাঁজা ও ইয়াবা বিক্রিতে পুরুষদের প্রবণতা বেশি। যৌন পেশায় যুক্ত নারীরা মূলত ইয়াবা বিক্রির সঙ্গে বেশি সম্পৃক্ত। অন্যদিকে, পেশাদার যৌনকর্মী নন এমন নারীদের মধ্যে হেরোইন ও গাঁজা বিক্রির হার তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা গেছে। ২৮৫ জন শুধু ইয়াবা বিক্রির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
ঢাকার এলাকাভিত্তিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, পল্টন ও বসুন্ধরা এলাকায় গাঁজা বিক্রেতাদের আধিক্য বেশি, যেখানে ২৫৩ জন শুধু গাঁজা বিক্রির কথা জানিয়েছেন। কমলাপুর রেলস্টেশন ও বাড্ডা এলাকায় ইয়াবা ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি বেশি পাওয়া গেছে। ফার্মগেট ও তেজগাঁও এলাকা গাঁজা ও ইয়াবা উভয়ই বিক্রির অন্যতম কেন্দ্রস্থল। এছাড়া ২৫০ জন বিক্রেতা হেরোইন ও গাঁজার সংমিশ্রণে ব্যবসা চালাচ্ছেন, যাদের প্রধান বিচরণক্ষেত্র সাভার ও পল্টন এলাকা। এ ছাড়া ২২৮ জন গাঁজা ও ইয়াবা—দুটিই বিক্রির কথা জানিয়েছেন।
মাদকদ্রব্য ঢাকায় প্রবেশের রুটগুলোও গবেষণায় চিহ্নিত হয়েছে। হেরোইন আসে পাকিস্তানের লাহোর থেকে ওয়াঘা সীমান্ত হয়ে ভারতের পাটনা দিয়ে, যা পরবর্তীতে সাভার, মিরপুর, মহাখালী ও মতিঝিলসহ রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়ায়। গাঁজা প্রবেশের দুটি প্রধান রুট হলো ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কুমিল্লা। ইয়াবার প্রধান উৎস মিয়ানমার; টেকনাফ সীমান্ত ছাড়াও ভারতের মিজোরাম ও মেঘালয় হয়ে এই মাদক বাংলাদেশে প্রবেশ করে। গবেষণায় এই রুটকে ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল’ নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। পরে একাধিক রুটে সিলেট ও সুনামগঞ্জ হয়ে ঢাকায় আসে। অবৈধ ও গোপন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে পরিচিত ব্যক্তি ও বিভিন্ন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারী সংগ্রহ করা হয়েছে।
এ ছাড়া জামালপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও ময়মনসিংহের বিভিন্ন সীমান্ত রুট দিয়েও মাদক প্রবেশের তথ্য পাওয়া গেছে। সামগ্রিক মানচিত্রে তিনটি প্রধান আন্তঃসীমান্ত রুট চিহ্নিত করা হয়েছে—পাকিস্তানের লাহোর থেকে ওয়াঘা-পাটনা হয়ে ঢাকা; ভারত থেকে মিজোরাম ও মেঘালয় হয়ে ঢাকা; এবং মিয়ানমার থেকে টেকনাফ হয়ে ঢাকা। এই ভয়াবহ চিত্রটি ঢাকার মাদক বাণিজ্যে অপরাধী চক্রগুলোর সুপরিকল্পিত শোষণেরই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট গবেষকরা।