ঢাকাই চলচ্চিত্রে খলনায়ক এবং নায়ক—উভয় ভূমিকাতেই সমানভাবে জনপ্রিয় ছিলেন কিংবদন্তি অভিনেতা জসীম। ১৯৯৮ সালের ৮ অক্টোবর মাত্র ৪৮ বছর বয়সে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আজ এই গুণী অভিনেতার মৃত্যুর ২৭ বছর পূর্ণ হলো। চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের মতে, বাংলাদেশের সিনেমার ইতিহাসে জসীম এমন একজন ব্যক্তিত্ব, যাঁকে ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়। তারপর একসময় নায়ক হয়ে জয় করে নিলেন দর্শকের হৃদয়। তিনি একমাত্র নায়ক, যিনি একাধারে ধুন্ধুমার অ্যাকশন দৃশ্য করে হাততালি কুড়িয়ে নিতেন, আবার নায়ক হয়ে দর্শকদের আবেগে জড়াতেন। মানুষটি গত শতকের সত্তর দশকে বর্তমান বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে অ্যাকশন ধারার প্রবর্তক। একসময় ‘আসামি হাজির’ ছবিতে ওয়াসিমের সঙ্গে তাঁর লড়াই দেখতে দর্শকেরা সিনেমা হলের দরজা ভেঙে ঢুকে পড়েছিলেন, এমন ঘটনাও ঘটেছিল।
১৯৫০ সালের ১৪ আগস্ট ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার বক্সনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করা এই অভিনেতা ছোটবেলা থেকেই ছিলেন দুঃসাহসী। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে ২ নম্বর সেক্টরে বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করেছিলেন তিনি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে ‘দেবর’ সিনেমার মাধ্যমে রূপালি পর্দায় তাঁর অভিষেক ঘটে। তবে ১৯৭৩ সালে জহিরুল হকের ‘রংবাজ’ সিনেমায় খলনায়ক হিসেবে অভিনয় করে তিনি প্রথম সবার নজরে আসেন। সেই সিনেমায় তাঁর অ্যাকশন দৃশ্যগুলো ছিল নিজস্ব প্রযোজনা সংস্থা ‘জ্যাম্বস ফাইটিং গ্রুপ’-এর করা।
ঢাকাই সিনেমায় অ্যাকশন ঘরানার প্রবর্তক হিসেবে জসীমকে গণ্য করা হয়। অনেক ফাইট ডিরেক্টর ও স্টান্টম্যান এখনো গর্বের সঙ্গে নিজেদের তাঁর ছাত্র হিসেবে পরিচয় দেন। তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য সিনেমার মধ্যে রয়েছে ‘তুফান’, ‘জবাব’, ‘নাগ-নাগিনী’, ‘বদলা’, ‘বারুদ’, ‘সুন্দরী’, ‘কসাই’, ‘লালু মাস্তান’, ‘নবাবজাদা’, ‘অভিযান’, ‘কালিয়া’, ‘বাংলার নায়ক’, ‘গরিবের ওস্তাদ’, ‘রাজা বাবু’, ‘স্বামী কেন আসামী’ এবং ‘মেয়েরাও মানুষ’সহ প্রায় দুই শতাধিক চলচ্চিত্র। দেওয়ান নজরুল পরিচালিত ‘দোস্ত দুশমন’ সিনেমায় গব্বর সিংয়ের চরিত্রে তাঁর অভিনয় এতটাই জীবন্ত ছিল যে, দর্শকরা সিনেমা হলে ঢোকার সময় আতঙ্কিত থাকতেন। এমনকি ভারতীয় অভিনেতা আমজাদ খানও তাঁর অভিনয়ের প্রশংসা করেছিলেন। যুদ্ধফেরত এই তরুণই পরবর্তীকালে ঢাকাই সিনেমায় আনলেন বীরত্ব, অ্যাকশন ও লড়াইয়ের নতুন ধারাবাহিকতা।
খলনায়ক হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘সবুজ সাথী’ সিনেমায় অভিনয়ের পর থেকে জসীম পুরোদস্তুর নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি পর্দায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করতেন। শাবানার সঙ্গে তাঁর জুটি ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়; মজার ব্যাপার হলো, তাঁরা যেমন প্রেমিক-প্রেমিকা হিসেবে পর্দায় রসায়ন তৈরি করেছেন, তেমনি ভাই-বোনের চরিত্রেও তাদের উপস্থিতি ছিল নজরকাড়া। রোজিনার সাথেও তাঁর জুটি ছিল ব্যবসা সফল। জসীম সাহেবের হাতে ফাইট শিখেছি অল্পদিনের চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের প্রিয় নায়ক হন তিনি।
ব্যক্তিগত জীবনে জসীম দুইবার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। তাঁর প্রথম স্ত্রী ছিলেন জনপ্রিয় নায়িকা সুচরিতা। পরে তিনি ঢাকার প্রথম সবাক ছবির নায়িকা পূর্ণিমা সেনগুপ্তার মেয়ে নাসরিনকে বিয়ে করেন। জসীমের তিন ছেলে—এ কে রাহুল, এ কে সামী ও এ কে রাতুল। বাবার পথ অনুসরণ করে চলচ্চিত্রে না আসলেও তাঁরা প্রত্যেকেই সংগীতের জগতে সুনাম কুড়িয়েছেন। দুঃখজনকভাবে, গত জুলাই মাসে জসীমের ছেলে রাতুল মারা যান এবং তাঁকে বাবার কবরের পাশেই সমাহিত করা হয়।
আজকের দিনে চলচ্চিত্রপাড়া জসীমকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছে। তিনি শুধু অভিনয়শিল্পী নন, বরং এক যুগের প্রতীক হিসেবে আজও দর্শকহৃদয়ে বেঁচে আছেন। তাঁর সাহস, ন্যায়বোধ এবং অভিনয়ের শৈলী নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য প্রেরণা হয়ে থাকবে।