বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১১:১২ পূর্বাহ্ন

উত্তরাঞ্চলে হৃদ্‌রোগ চিকিৎসায় আস্থার প্রতীক টিএমএসএস হার্ট সেন্টার

প্রতিবেদকের নাম

উত্তরাঞ্চলের বাসিন্দাদের কাছে হৃদ্‌রোগের চিকিৎসায় নির্ভরযোগ্য একটি নাম হয়ে উঠেছে টিএমএসএস হার্ট সেন্টার। প্রতিষ্ঠানের উপনির্বাহী পরিচালক ও হেলথ সেক্টরের প্রধান ডা. মো. মতিউর রহমান জানিয়েছেন, হৃদ্‌রোগের জটিলতা নিরসনে তারা নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছেন। ওয়ার্ল্ড হার্ট ফেডারেশনের এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘ডোন্ট মিস আ বিট’-এর গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি জানান, হৃদ্‌রোগ অনেক সময় কোনো উপসর্গ ছাড়াই শরীরে বাসা বাঁধে। অস্বাভাবিক ক্লান্তি, সামান্য পরিশ্রমে হাঁপিয়ে ওঠা, পা ফুলে যাওয়া, চোয়াল বা পিঠে ব্যথা, বমিভাব কিংবা অনিয়মিত হৃদস্পন্দনের মতো লক্ষণগুলো অবহেলা করা উচিত নয়। বিশেষ করে নারী, বয়স্ক ব্যক্তি ও ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে রোগের লক্ষণগুলো ভিন্ন হতে পারে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বগুড়ায় নিজস্ব প্রতিবেদক আনোয়ার পারভেজ। ছোট একটি বাক্য, কিন্তু এর তাৎপর্য অনেক। নারী, ডায়াবেটিসের রোগী ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে প্রচলিত লক্ষণ না–ও থাকতে পারে। আবার ওষুধ শুরু করার পর নিয়মিত ফলোআপ করেন না। মতিউর রহমান: প্রতিরোধের জায়গায় সচেতনতার ভূমিকা সবচেয়ে বেশি।

উচ্চ রক্তচাপকে হৃদ্‌রোগের প্রধান ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করে তিনি বলেন, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা স্ক্রিনিংয়ের অভাবে অনেক মানুষ নিজের ঝুঁকি সম্পর্কে জানে না। উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তদের একটি বড় অংশের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে না। দেশে অসংক্রামক রোগের প্রকোপ বেড়েই চলেছে, যার মধ্যে হৃদ্‌রোগ অন্যতম। সরকারি হিসাব ও বিদ্যমান পরিস্থিতি অনুযায়ী, প্রতিবছর দেশে প্রায় ২ লাখ ৮৩ হাজার ৮০০ জন হৃদ্‌রোগে বা এর সংশ্লিষ্ট জটিলতায় মৃত্যুবরণ করেন। এছাড়া উচ্চ রক্তচাপের হার ২৭ দশমিক ৩ শতাংশ, ডায়াবেটিস ৯ দশমিক ৮ শতাংশ এবং উচ্চ কোলেস্টেরলের মাত্রা ৩০ দশমিক ২ শতাংশের মতো উদ্বেগজনক অবস্থানে রয়েছে। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে সবাইকে উৎসাহিত করতে হবে।

হৃদ্‌রোগ শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে ডা. মতিউর রহমান নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার অভাবকে দায়ী করেছেন। অনেকেই অসুস্থ হওয়ার আগ পর্যন্ত রক্তচাপ বা শর্করা পরীক্ষা করেন না। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার ক্ষেত্রে ফলোআপের অভাবও বড় সমস্যা। ভৌগোলিক বৈষম্য নিয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশের হৃদ্‌রোগ চিকিৎসা মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক ছিল। উত্তরাঞ্চলের একজন রোগীর জন্য ঢাকায় পৌঁছানোর সময়টুকু জীবন-মৃত্যুর পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। এই ঝুঁকি কমাতে ঢাকার বাইরে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানো অপরিহার্য।

টিএমএসএস হার্ট সেন্টারের কার্যক্রম প্রসঙ্গে তিনি জানান, প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ড. হোসনে আরা বেগমের নেতৃত্বে তারা তৃণমূল পর্যায়ে সেবা ছড়িয়ে দিচ্ছেন। রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও ওজন পরিমাপের মাধ্যমে ঝুঁকি শনাক্তকরণে তারা বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন। টিএমএসএস হার্ট সেন্টারে প্রাথমিক কার্ডিওলজি বিভাগ থেকে শুরু করে এখন বিভিন্ন বিশেষায়িত সেবা চালু হয়েছে, যা উত্তরাঞ্চলের রোগীদের ঢাকামুখী হওয়ার প্রবণতা অনেকাংশে কমিয়ে এনেছে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে ডা. মতিউর রহমান জানান, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বিশেষায়িত চিকিৎসা পর্যন্ত একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা তাদের লক্ষ্য। টিএমএসএস হার্ট সেন্টারকে ভবিষ্যতে হৃদ্‌রোগ চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও গবেষণার একটি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে হৃদ্‌রোগের ব্যয়বহুল চিকিৎসা সামগ্রী ও আমদানিনির্ভর উপকরণের কারণে সাধারণ রোগীদের সাশ্রয়ী সেবা দেওয়া বড় একটি চ্যালেঞ্জ। এছাড়া বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট এবং রোগীকে দ্রুত জরুরি সেবার আওতায় আনা নিয়েও কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। রোগীর খরচ কম রাখা এবং দরিদ্র রোগীদের সহায়তা করা তাই বড় চ্যালেঞ্জ। পাশাপাশি রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে আনার ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।

সবশেষে তিনি পরামর্শ দেন, প্রতিরোধই হৃদ্‌রোগের সবচেয়ে বড় সুরক্ষা। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা, লবণ ও চিনি কম খাওয়া, তামাক ও ই-সিগারেট বর্জন, শাকসবজি গ্রহণ এবং পর্যাপ্ত ঘুমের অভ্যাস গড়তে হবে। প্রতিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রক্তচাপ মাপা নিয়মিত সেবার অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। তিনি মনে করেন, সচেতনতা পরিবার থেকে সমাজের প্রতিটি স্তরে পৌঁছে দিতে পারলে অকাল মৃত্যু রোধ করা সম্ভব।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


আমাদের ফেসবুক পেইজ