বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০২:১৪ অপরাহ্ন
শিরোনাম :

উপনিবেশোত্তর রাষ্ট্রকাঠামো ও জাতিসত্তার গণতান্ত্রিক সংকট

প্রতিবেদকের নাম

ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার ঔপনিবেশিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিবর্তন এক জটিল যাত্রাপথ অতিক্রম করেছে। বাংলাদেশের সশস্ত্র স্বাধীনতাযুদ্ধে বাংলা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী চেতনার পাশাপাশি দেশের অবাঙালি সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীসমূহের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ ছিল। বীরত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ অনেক অবাঙালি মুক্তিযোদ্ধা রাষ্ট্রীয় খেতাবও অর্জন করেছিলেন। কিন্তু ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়নের সময় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ কেবল ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’কে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করে। সংবিধানের সেই বয়ানে বলা হয়েছিল, ভাষা ও সংস্কৃতিগতভাবে একক বাঙালি জাতির ঐক্যই হবে জাতীয়তাবাদের ভিত্তি। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ভারতের পশ্চিমবাংলা থেকে বাংলাদেশের বাঙালিকে পৃথক করার চেষ্টা থাকলেও, মুক্তিযুদ্ধের সময় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করা সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীগুলোকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দানে রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়। ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার ঔপনিবেশিক রাজনীতি ৩৪। আমরা আগেই বলেছি, বাংলাদেশের সশস্ত্র স্বাধীনতাযুদ্ধের পেছনে প্রধানত বাংলা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী চেতনা সক্রিয় থাকলেও, দেশটির অপরাপর অবাঙালি সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীসমূহের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ সেই মরণপণ যুদ্ধে নানাভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। অবাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে কেউ কেউ এমনকি অসমসাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য স্বাধীনতা-উত্তর সরকারের কাছ থেকে স্বীকৃতি হিসেবে রাষ্ট্রীয় খেতাবও অর্জন করেছিলেন। সাংবিধানিকভাবে গৃহীত এই জাতীয়তাবাদের সংজ্ঞা নিরূপণ করেলেখা হয়, “ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত একক সত্তাবিশিষ্ট যে বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ ও সংকল্পবদ্ধ সংগ্রাম করিয়া জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জন করিয়াছেন, সেই বাঙালি জাতির ঐক্য ও। 286. কিন্তু অগ্রে জাতি ভাষা না শিখিয়া পরের ভাষা শিখা কোনও মতে উচিত নহে।”২৯০ তথ্যসূত্র: ২৮৬ দেখুন, প্রাগুক্ত, ১৯৭২, অনুচ্ছেদ ৯ ২৮৭ আনিসুজ্জামান, “আমাদের মুক্তিসংগ্রাম ও সংবিধানের মূলনীতি”, বাঙালী ও বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা: ১১৪। সর্বোপরি, যে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান তার সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকদের ধর্ম-বিশ্বাসকে ‘রাষ্ট্রীয় মর্যাদা’ দান করে সংখ্যালঘু নাগরিক সম্প্রদায় সমূহের ধর্ম বিশ্বাসকে অধস্তন স্তরে নামিয়ে আনে, সে প্রতিষ্ঠানকে নিশ্চয় ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ হিসেবে বিবেচনা করার অবকাশ থাকে না। 124 ২৮৯ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান, ২০১১, অনুচ্ছেদ ৬[২] ২৯০ ঈশ্বরচন্দ্র শর্মা, “বাক্যকথন – ভাষা”, বোধোদয়, পৃষ্ঠা: ৩২।

স্বাধীনতার পর বাঙালি শাসকশ্রেণির মধ্যে এক ধরনের উগ্র জাতিবাদী আত্মাভিমান প্রবল হয়ে ওঠে, যা অবাঙালি জনগোষ্ঠীকে ‘উপজাতি’ বা নিম্নতর মর্যাদায় ঠেলে দেয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান অবাঙালি জাতিগোষ্ঠীগুলোকে বাঙালি হয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমাসহ অন্যান্য জনগোষ্ঠীকে ‘ট্রাইব’ আখ্যায়িত করে তাদের বাঙালি হওয়ার ‘প্রমোশন’ দেওয়ার বিষয়টি বর্ণবাদী ঔপনিবেশিক চিন্তারই প্রতিফলন ছিল। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে, এই ধরণের জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ববাদ বিংশ শতাব্দীর ফ্যাসিবাদী ভাবাদর্শের সাথে তুলনীয়। পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’কে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ দ্বারা প্রতিস্থাপন করে অন্তর্ভুক্তিমূলক করার চেষ্টা করা হলেও, ‘উপজাতি’ বা ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’র মতো উপনিবেশবাদী নেতিবাচক বিশেষণগুলো ব্যবহারের সংস্কৃতি আজও বিদ্যমান রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, স্বাধীনতা-উত্তর বাঙালি শাসকশ্রেণির ‘জাতিবাদী’ আত্মাভিমান এমন উৎকট পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, এই শাসকশ্রেণি অবাঙালি সংখ্যালঘু জাতিসত্বাগুলোকে ‘উপজাতি’র অধস্তন মর্যাদায় চিহ্নিত করে এবং সেই শাসকশ্রেণির প্রধান নেতা শেখ মুজিবুর রহমান এদেশের অবাঙালি। 287. ‘নিছক ট্রাইব’ আখ্যায়িত করে, মুজিব নিজের কথিত‘ঔদার্যবশত’ তাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে ‘প্রমোশন’ দেয়ার ইচ্ছাও প্রকাশ করেছিলেন।২৮৮ মুজিব ও লীগের তরফে এই ‘ঔদার্য’ প্রদর্শনের আকাঙ্ক্ষা আসলে ছিল বর্ণবাদী ঔপনিবেশিক চিন্তার অনুবর্তী এক উগ্র ‘জাতিবাদী’ রাজনীতির উৎকট অভিপ্রকাশ। অন্যদিক থেকে দেখলে, জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ববাদ যদি ফ্যাসিবাদী ভাবাদর্শের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক উপাদান হয়ে থাকে – বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে হিটলারের নেতৃত্বাধীন জার্মান শাসকশ্রেণীর চিন্তার মধ্যে আমরা যেমন দেখতে পাই – তাহলে বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে স্বাধীনতা-উত্তর। ২৮৮ Dr. Mizanur Rahman Shelley (ed। বলার অপেক্ষা রাখেনা, এই সব উৎকৃষ্টতাবাদী জাতিবাদ ও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা মূলত আধিপত্যবাদ এদেশের শাসকশ্রেণীর ঔপনিবেশিক চিন্তা-চেতনারই বিভিন্ন অভিপ্রকাশ মাত্র।

২০১১ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এক বিতর্কিত ও পরস্পরবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করে। সেখানে বলা হয়েছে, “বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসাবে বাঙালি এবং নাগরিক হিসাবে বাংলাদেশি বলিয়া পরিচিত হইবেন।” এই ঘোষণার মাধ্যমে অবাঙালি জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব জাতিসত্তার স্বকীয়তাকে কার্যত অস্বীকার করা হয়েছে। একই সাথে, রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে ধর্মনিরপেক্ষতার পাশাপাশি ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে বহাল রাখা হয়। রাষ্ট্র একই সাথে ধর্মনিরপেক্ষ এবং ধর্মীয় পরিচয়ে সংজ্ঞায়িত হওয়ার এই সাংঘর্ষিক অবস্থান প্রকৃত গণতান্ত্রিক চর্চার পরিপন্থী। যে রাষ্ট্র সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মকে প্রাধান্য দিয়ে সংখ্যালঘুদের অবস্থানকে গৌণ করে ফেলে, তা গণতান্ত্রিক হওয়ার দাবি রাখে না। কিন্তু তখনো বাঙালি শাসকশ্রেণির দিক থেকে অবাঙালি জাতিগোষ্ঠীসমূহকে ‘ট্রাইব’, ‘উপজাতি’, ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ প্রভৃতি উপনিবেশবাদী চিন্তাপ্রসূত নেতিবাচক বিশেষণে আখ্যায়িত করা হতো – আজও তা অব্যাহত রয়েছে।এ বিষয়ে সমাজে ইতিমধ্যে বহু আলোচনা, সমালোচনা ও পর্যালোচনার। 2011. “বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসাবে বাঙালি এবং নাগরিক হিসাবে বাংলাদেশি বলিয়া পরিচিত হইবেন।”২৮৯ স্পষ্টতই, বাংলাদেশের জনগণের অংশ হিসেবে, অবাঙালি জাতিগোষ্ঠীসমূহের জাতীয় পরিচয়ও ‘বাঙালি’ হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত থাকে। একটি রাষ্ট্রকে একই সঙ্গে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ ও ‘ধর্মীয়প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে বিকশিত করার ধারণাটি হাস্যকর বটে।

ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো এশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকা মহাদেশে দীর্ঘ পাঁচ শতাধিক বছর ধরে ইতিহাস, শিক্ষা ও ভাষার রাজনীতির মাধ্যমে শোষণের কাঠামো বজায় রেখেছিল। এই ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থাই পরবর্তীতে বিভিন্ন স্বাধীন রাষ্ট্রের রাজনীতি ও সংস্কৃতির গভীরে বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমান প্রজন্মের জন্য এই ইতিহাস অনুধাবন করা জরুরি হলেও, শুধুমাত্র অতীতের গ্লানি নিয়ে আটকে থাকা কোনো সমাধান নয়। বরং ঔপনিবেশিক মানসিকতার যাবতীয় অবশেষ থেকে মুক্ত হয়ে একটি সমতাভিত্তিক ও সৃজনশীল রাষ্ট্র গঠনই এখন সময়ের দাবি। ড. মিজানুর রহমান শেলী সম্পাদিত ‘দ্য চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস অব বাংলাদেশ: দ্য আনটোল্ড স্টোরি’ বা আনিসুজ্জামানের ‘বাঙালি ও বাংলাদেশ’ গ্রন্থের আলোকে বিচার করলে এটি স্পষ্ট যে, বাংলাদেশসহ উপনিবেশোত্তর রাষ্ট্রগুলোকে সত্যিকারের মুক্তি পেতে হলে শাসকশ্রেণি ও জনগণের মন ও মননের বিউপনিবেশায়ন ঘটাতে হবে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ‘বোধোদয়’ গ্রন্থেও ভাষার গুরুত্ব নিয়ে যে চিন্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল, তা আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের ক্ষেত্রে আজও প্রাসঙ্গিক। আমরা এই দীর্ঘ প্রবন্ধে দীর্ঘক্ষণ ধরে দেখেছি, ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহ নিজেদের স্বার্থে এশিয়া, আফ্রিকা এবং উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার নানা দেশে, ৫০০ বছরেরও বেশী সময় ধরে, ইতিহাস-চর্চা, ভাষা ও শিক্ষার উপনিবেশবাদী রাজনীতির ম। The Chittagong Hill Tracts of Bangladesh: The Untold Story, p। সেই ঔপনিবেশিক শোষন-শাসন ও নিপীড়নের দীর্ঘস্থায়ী বিষফল উপনিবেশোত্তর দেশ ও রাষ্ট্রসমূহের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনকে নেতিবাচকভাবে কিভাবে প্রভাবিত করেছে, করে চলেছে এখনো, তাও এই প্রবন্ধে আলোচিত হয়েছে। উপনিবেশোত্তর যে-কোনো সমাজের বিশেষত তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য এই ইতিহাস জেনে রাখা শুধু নয়, নিরন্তর মনে রাখাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই ইতিহাস পাঠ ও বিশ্লেষণের গুরুত্ব নিশ্চয় পুরনো ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহকে নিরন্তর অভিসম্পাত করে সেই পুরনো ইতিহাসের ভেতরেই নিজেদের বন্দী থাকার মধ্যে হতে পারে না, বরং আপন আপন দেশে সমতাভিত্তিক গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে তোলার লক্ষ্যে, পুরনো ঔপনিবেশিক। নয় এবার অতি সংক্ষেপে কয়েকটি সতর্কতামূলক প্রতিপাদ্য উপস্থাপন করেবর্তমান রচনাটির ইতি টানব। প্রথমত, আমরা ইতিপূর্বে বলেছি, আমাদের উপনিবেশোত্তর দেশগুলোর সমাজ ও রাষ্ট্রের যথার্থ গণতান্ত্রিক মুক্তির জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে তাদের আপন আপন ইতিহাসকে পশ্চিমা উপনিবেশবাদী বয়ান থেকে মুক্ত করে, বস্তুনিষ্ঠ গবেষণার ভিত্তিতে, নিজেদের ইতিহাসের পুনর্গঠন করতে হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


আমাদের ফেসবুক পেইজ