খাবার, সংস্কৃতি এবং জীবনধারা নিয়ে গত এক দশক ধরে কাজ করছেন কনটেন্ট ক্রিয়েটর তান্হা ইসলাম। এই দীর্ঘ সময়ে ভিন্ন ভিন্ন দেশের খাবারের স্বাদ ও সংস্কৃতির খোঁজে তিনি বিশ্বের ১০টিরও বেশি দেশ ঘুরে বেড়িয়েছেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২০ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর জার্মানির গ্যেটে ইনস্টিটিউট ও দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ আমন্ত্রণে ‘কালিনারি ট্রেন্ডস ইন জার্মানি’ শীর্ষক এক বিশেষ আয়োজনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান এই বাংলাদেশি প্রতিনিধি। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির এই স্নাতক মূলত খাবারদাবার ও ভ্রমণবিষয়ক কনটেন্ট তৈরি করেন।
বিশ্বের ১৫টি দেশ থেকে মোট ১৫ জন পেশাজীবী এই সফরে যোগ দিয়েছিলেন, যাদের মধ্যে ১০ জনই ছিলেন রন্ধনশিল্পী। বাকিরা ফুড ফটোগ্রাফার, কনটেন্ট নির্মাতা ও খাদ্যবিষয়ক পেশাজীবী হিসেবে এই দলে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। সফরের প্রায় তিন মাস আগে থেকেই জার্মান দূতাবাসের সঙ্গে তান্হার কয়েক দফা প্রশ্নোত্তর ও আলোচনা চলে, যার চূড়ান্ত পর্যায়ে তিনি এই আমন্ত্রিত দলের সদস্য হন। সেসব শুনতেই যোগাযোগ করি তান্হার সঙ্গে। ভর্তি–যুদ্ধের গল্প নিয়ে শিক্ষার্থীরা বানিয়েছেন চলচ্চিত্র, নাম অন্যপাতা।
জার্মানিতে পৌঁছানোর পর প্রথম দিন সন্ধ্যায় বার্লিনের ঐতিহাসিক ক্ল্যারশেস বলহাউসের লুনা ডি’ওরো রেস্তোরাঁয় স্বাগত নৈশভোজের মাধ্যমে সফরের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। সেখানে রন্ধনশিল্পী টোবি বেক জার্মানির আঞ্চলিক খাবারের বৈচিত্র্য, ইতিহাস এবং তৈরির পদ্ধতি তুলে ধরেন। পরের দিন গ্যেটে ইনস্টিটিউটে আয়োজিত পরিচয়পর্বে ১৫ জন অংশগ্রহণকারীই তাদের সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইলের মাধ্যমে নিজ নিজ কাজের অভিজ্ঞতা বিনিময় করেন। নিজ নিজ সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইল বড় পর্দায় দেখিয়ে তাঁরা নিজেদের কাজ তুলে ধরেন, ভাগ করে নেন মজার সব অভিজ্ঞতা। নিরামিষ ও উদ্ভিদনির্ভর খাবারের নানা ধরনও চেখে দেখেছেন তাঁরা।
সফরটির অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল জার্মানির খাদ্যসংস্কৃতিকে গভীরভাবে বোঝা। তাই অংশগ্রহণকারীদের জন্য স্থানীয় সাধারণ বাজার, সুপারমার্কেট এবং অভিজাত কাদেওয়ে শপিং সেন্টারে ঘুরে বেড়ানোর আয়োজন করা হয়েছিল। এ বিষয়ে তান্হা বলেন, জার্মানির খাবার বুঝতে কেবল রেস্তোরাঁ নয়, সাধারণ মানুষ কোথা থেকে কী কিনছে এবং কোন খাবারের দিকে ঝোঁক বেশি, তা দেখাও জরুরি। এছাড়া বার্লিনের গাটোর এলাকার ভিয়ারফেল্ডারহফ জৈব খামারে শস্য থেকে রুটি তৈরির কর্মশালায় অংশ নিয়ে জার্মানদের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসে রুটির গুরুত্ব ও শ্রম সম্পর্কেও তিনি অভিজ্ঞতা লাভ করেন। তবে জার্মানির এবারের সফরটি ছিল আলাদা।
জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সফরের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তান্হা জানান, তাদের আপ্যায়ন প্রক্রিয়া ছিল বিশেষ। সেখানে তিনি বুঝতে পেরেছেন যে, জার্মানির রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে উন্নত খাবারের আয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। তান্হার ভাষ্যমতে, খাবার মানুষের মনোজগতে ও চিন্তাভাবনায় প্রভাব ফেলে এবং এটি কেবল ক্ষুধা মেটানোর মাধ্যম নয়, বরং আলোচনার পরিবেশ তৈরির একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। রাষ্ট্রদূতদের জন্য যেভাবে খাবারদাবারের আয়োজন করা হয়, প্রায় একই কায়দায় আপ্যায়ন করা হয়েছে তান্হাদেরও।
সফরের পরবর্তী ধাপে বার্লিন থেকে ট্রেনে ফ্রাইবুর্গে যান অংশগ্রহণকারীরা। সেখানে ব্ল্যাক ফরেস্ট কেক তৈরির কর্মশালায় অংশ নেওয়া ছিল সফরের অন্যতম আকর্ষণ। তান্হা জানান, ব্যক্তিগতভাবে ব্ল্যাক ফরেস্ট কেক তাঁর খুব পছন্দের হলেও জার্মানিতে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন যে, দেশের প্রচলিত স্বাদের সঙ্গে সেখানকার মূল সংস্কৃতির আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে। উল্লেখ্য, এর আগে ২০২৩ সালে টিকটকের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিভাগের আমন্ত্রণে নেপাল সফর করেছিলেন তান্হা। সাত দিনের এই জার্মানি সফর থেকে তিনি স্থানীয় উৎপাদনকারীদের গুরুত্ব এবং খাদ্য সচেতনতা সম্পর্কে নতুন করে শিক্ষা নিয়েছেন বলে জানান।