দেশের তরুণ প্রজন্মকে স্বাবলম্বী ও উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ১০০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই তহবিল থেকে যোগ্য তরুণরা কোনো ধরনের জামানত ছাড়াই সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা পাবেন। ঋণের সুদহার ৪ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা বর্তমান বাজারদরের তুলনায় অনেক কম।
গত মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) বিকেলে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) নেতাদের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে এবিবির চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন সাংবাদিকদের জানান, তরুণদের জন্য বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন ও অনুদান প্যাকেজ তৈরির প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। মূলত মূলধনের অভাবে যারা ব্যবসা শুরু করতে পারছেন না, তাদের এই কর্মসূচির আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই প্রকল্পের একটি বড় আকর্ষণ হলো ঋণের পাশাপাশি অনুদানের সুযোগ। মাসরুর আরেফিন জানান, কোনো উদ্যোক্তা যদি নির্ধারিত সময়ে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করেন এবং তার ব্যবসার কার্যক্রম সন্তোষজনক হয়, তবে ব্যাংকের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিল থেকে তাকে অনুদান দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ, ১০ লাখ টাকা ঋণ নেওয়ার পর শর্ত পূরণ সাপেক্ষে একজন উদ্যোক্তা আরও সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অনুদান পাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারবেন।
বর্তমানে প্রচলিত ব্যাংকঋণের সুদহার ১১ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যে থাকে, যা নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য বেশ ব্যয়বহুল। এনজিও ঋণের খরচও তুলনামূলক বেশি। এই প্রেক্ষাপটে ৪ থেকে ৬ শতাংশ সুদের এই অর্থায়ন তরুণদের জন্য অত্যন্ত সহায়ক হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এছাড়া, কোনো ধরনের সম্পদ বা জমি বন্ধক রাখার বাধ্যবাধকতা না থাকায় উদ্যোক্তার দক্ষতা ও ব্যবসার আইডিয়াই হবে ঋণ পাওয়ার প্রধান যোগ্যতা।
প্রাথমিকভাবে দেশের ৫০০টির বেশি উপজেলা থেকে অন্তত ৫ হাজার নতুন উদ্যোক্তাকে এই সুবিধার আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাংকগুলোর শাখা ব্যবস্থাপক বা নির্ধারিত কমিটির মাধ্যমে যোগ্য উদ্যোক্তা খুঁজে বের করা হবে। এর ফলে তদবির বা প্রভাব বিস্তারের সুযোগ কমে আসবে এবং প্রকৃত উদ্যোক্তাদের কাছে অর্থ পৌঁছানো সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এবিবি চেয়ারম্যান জানান, ব্যাংকগুলো নিজেদের মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে নিয়ে উপজেলা পর্যায়ে সম্ভাব্য উদ্যোক্তাদের যাচাই-বাছাই করবে। এক্ষেত্রে ব্যবসার সম্ভাবনা, উদ্যোক্তার ব্যক্তিগত দক্ষতা এবং উদ্যোগটি বাস্তবে পরিচালনার সক্ষমতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
প্রস্তাবিত এই তহবিল নির্দিষ্ট কোনো খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে না। উৎপাদনমুখী ও বাণিজ্য উভয় ধরনের উদ্যোগই এই সুবিধার আওতায় আসতে পারবে। বিশেষ করে মৎস্য চাষ, প্রাণিসম্পদ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হস্তশিল্প, শতরঞ্জি তৈরি এবং অন্যান্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের মতো খাতগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও এবিবির এই যৌথ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে একদিকে যেমন তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়ার পথ সুগম হবে, অন্যদিকে তৃণমূল পর্যায় থেকে নতুন কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হবে। এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
এ ঋণের সুদহার ৪ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে রাখার প্রস্তাব নিয়ে কাজ চলছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জামানতের বাধা না থাকায় নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।