নওগাঁ সদর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে গত ২ অক্টোবর ২০২৬ সকালে জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে শুরু হয় ‘শিখো- জিপিএ-৫ কৃতী সংবর্ধনা’ অনুষ্ঠান। ‘স্বপ্ন দেখো, জীবন গড়ো’ স্লোগানকে উপজীব্য করে সারা দেশের ৬৪টি জেলায় এই আয়োজন করা হচ্ছে, যার ধারাবাহিকতায় নওগাঁয় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের স্বীকৃতি জানানো হয়। শিক্ষার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম শিখোর পৃষ্ঠপোষকতায় এবং বিকাশের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই আয়োজনে নওগাঁ সদরসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে শিক্ষার্থীরা অংশ নেয়। সকাল ১০টা থেকে শুরু হওয়া এই উৎসবমুখর অনুষ্ঠানে বন্ধুদের সঙ্গে দীর্ঘদিন পর দেখা হওয়ার আনন্দ ছিল শিক্ষার্থীদের চোখেমুখে। অনেকে মুঠোফোনের ক্যামেরায় বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলে মুহূর্তটি ধরে রাখার চেষ্টা করছিল। বন্ধুদের কেউ কেউ বলছিল, ‘কী রে, কেমন আছিস?’।
অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছিল নিয়ামতপুর উপজেলার গুড়িহারী-কামদেবপুর আলোর পাঠশালা থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া সাফিয়া খাতুন। প্রায় ৬০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে দিনমজুর বাবার সঙ্গে সে এই সংবর্ধনায় যোগ দেয়। সাফিয়া তার সাফল্যের পেছনে মা-বাবার উৎসাহ ও শিক্ষকদের অবদানের কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্বীকার করে। নওগাঁ সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নওশিন বিনতে রউফ জানায়, পরীক্ষার পর অনেক বন্ধু বিভিন্ন স্থানে চলে গেলেও এই আয়োজনে এসে তাদের অনেকের সঙ্গে পুনর্মিলন সম্ভব হয়েছে। একই বিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ অর্জনকারী যমজ বোন শুভমিতা রায় ও সমাদ্রিতা রায়ও এই আয়োজন নিয়ে নিজেদের উচ্ছ্বাসের কথা জানায়। শুভমিতা বলে, ‘আমাদের সাফল্য উদ্যাপন করতে এত বড় আয়োজন। সে নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলায় ট্রাস্ট পরিচালিত গুড়িহারী-কামদেবপুর আলোর পাঠশালা থেকে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে। এই সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান আমার বাবা-মায়ের। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও তাঁরা পড়াশোনায় উৎসাহ দিয়েছেন। শিক্ষকেরাও অনেক সহযোগিতা ও দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।
অনুষ্ঠানে নওগাঁর বিশিষ্ট আইনজীবী ও সমাজকর্মী ডি এম আব্দুল বারী শিক্ষার্থীদের কেবল পাঠ্যবইয়ে সীমাবদ্ধ না থেকে সহশিক্ষা কার্যক্রমের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বর্তমান প্রযুক্তিগত অগ্রগতির কথা তুলে ধরে তিনি শিক্ষার্থীদের আইটি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) শিক্ষার প্রতি বিশেষ মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, শুধু অর্থ উপার্জন বা গতানুগতিক পেশার পেছনে না ছুটে, বরং দেশ ও সমাজের বৃহত্তর কল্যাণে নিজেকে দক্ষ করে গড়ে তোলাই হোক লক্ষ্য। এছাড়া নওগাঁ সরকারি বিএমসি মহিলা কলেজের সহকারী অধ্যাপক বিধান চন্দ্র সাটিয়ার ও নওগাঁ কেডি সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষক হাসমত আলী অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন। পরিচিত মুখ দেখলেই কেউ ছুটে গিয়ে বন্ধুকে জড়িয়ে ধরছিল, কেউ হাত মেলাচ্ছিল।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে রাজশাহীর নিজস্ব প্রতিবেদক আবুল কালাম মুহাম্মদ আজাদ বলেন, জীবনে ভালো কিছু করার জন্য মাদক থেকে দূরে থাকা, সর্বদা সত্য কথা বলা এবং মুখস্থ বিদ্যার ওপর নির্ভর না করার বিকল্প নেই। তিনি শিক্ষার্থীদের তিনটি ‘মা’ অর্থাৎ জন্মদাত্রী মা, জন্মভূমি ও মাতৃভাষার প্রতি অনুগত ও শ্রদ্ধাশীল থাকার আহ্বান জানান। সংবর্ধনা অনুষ্ঠান চলাকালে নওগাঁ বন্ধুসভার উপদেষ্টা ও রাণীনগর মহিলা কলেজের সহকারী অধ্যাপক বেলায়েত হোসেন শিক্ষার্থীদের মাদক, মিথ্যা ও মুখস্থবিদ্যাকে না বলার শপথ পাঠ করান। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন নওগাঁ প্রতিনিধি ওমর ফারুক, আর অভিভাবকদের পক্ষে কথা বলেন দেওয়ান মাহবুব আলম ও মিনা আক্তার।
বেলা সাড়ে ১১টার দিকে অনুষ্ঠান শেষ হলেও শিক্ষার্থীদের আড্ডার রেশ দীর্ঘক্ষণ বজায় থাকে। ক্রেস্ট গ্রহণ এবং বন্ধুদের সঙ্গে শেষবারের মতো ছবি তোলা বা ফোন নম্বর বিনিময়ের মধ্য দিয়ে দিনটি তাদের কাছে স্মরণীয় হয়ে ওঠে। উল্লেখ্য, এই আয়োজনে কনকর্ড গ্রুপ, ফ্রেশ, সেভয় আইসক্রিম, কনকা-গ্রী, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি, কোয়ালিটি গ্রুপ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, জিংক বি, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ শাখা ক্যাম্পাস, আম্বার আইটি লিমিটেড, এটিএন বাংলা ও বন্ধুসভা সহযোগী হিসেবে যুক্ত ছিল।