বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩২ পূর্বাহ্ন

নাটোরের বৃ-চাপিলা শাহী মসজিদ: জঙ্গল পরিষ্কার করতে গিয়ে মিলল ৪০০ বছরের পুরোনো ইতিহাস

প্রতিবেদকের নাম

নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার বৃ-চাপিলা গ্রামে অবস্থিত বৃ-চাপিলা শাহী জামে মসজিদটি কয়েক শতাব্দীর ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। জেলা শহর থেকে প্রায় ২৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই প্রাচীন স্থাপনাটি স্থানীয়দের কাছে ‘গায়েবি মসজিদ’ নামে পরিচিত। মুঘল স্থাপত্যশৈলীর ছাপ বহনকারী এই মসজিদটির তিনটি বড় গম্বুজ, পুরু দেয়াল এবং কারুকাজ করা প্রবেশদ্বার এর ঐতিহাসিক গুরুত্বকে তুলে ধরে। উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ১৬২৮ থেকে ১৬৫৮ সালের মধ্যে কোনো এক সময়ে মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, সম্রাট শাহজাহানের শাসনামলে তার ছেলে শাহ সুজা বাংলার সুবাদার থাকাকালে চাপিলা অঞ্চলটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল। সেখানে মুঘল সেনাদের একটি ফাঁড়ি ছিল এবং তাদের পাশাপাশি স্থানীয় মুসলমানদের নামাজের সুবিধার্থে মুনশি এনায়েতউল্লাহ এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে ওই এলাকার গুরুত্ব কমে গেলে জনবসতি হ্রাস পায় এবং একসময় পুরো এলাকাটি বড় বড় বেতঝোপ ও জঙ্গলে ঢেকে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে মসজিদটি মানুষের চোখের আড়ালে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল।

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এসে পুনরায় সেখানে বসতি স্থাপন শুরু করেন। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, জঙ্গল পরিষ্কার করতে গিয়েই তারা দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকা এই প্রাচীন মসজিদটির সন্ধান পান। এরপর স্থানীয় উদ্যোগে মসজিদটি পরিষ্কার ও সংস্কার করা হয় এবং পুনরায় সেখানে নামাজ আদায় শুরু হয়। জঙ্গলের ভেতর থেকে হঠাৎ মসজিদটি খুঁজে পাওয়ার ঘটনাকে ঘিরে এলাকায় নানা লোককথা ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে অনেকে একে অলৌকিকভাবে তৈরি ‘গায়েবি মসজিদ’ হিসেবে অভিহিত করতে শুরু করেন।

ইট ও সুড়কি দিয়ে নির্মিত এই মসজিদটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৪০ ফুট এবং প্রস্থ প্রায় ২০ ফুট। এর দেয়ালগুলো প্রায় চার ফুট পুরু। মূল ভবনের দুই পাশে দুটি মিনার রয়েছে এবং গম্বুজ ও মিনারের চূড়ায় চাঁদ-তারার প্রতীক খোদাই করা আছে। সংস্কারের সময় গম্বুজগুলোতে সোনালি রঙের প্রলেপ দেওয়া হয়েছে। মসজিদের ভেতরে প্রবেশের জন্য তিনটি কারুকাজ করা দরজা রয়েছে। যদিও দীর্ঘ সময়ের ক্ষয়ক্ষতি ও বিভিন্ন সময়ে সংস্কারের ফলে প্রাচীন কারুকাজের কিছু অংশ বিলীন হয়ে গেছে, তবুও এর স্থাপত্যশৈলী মুঘল আমলের নির্মাণরীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

মসজিদের খতিব মাওলানা মাহমুদুল্লাহ জানান, শুরুর দিকে মসজিদটিতে তিন কাতারে প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ জন মুসল্লির নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা ছিল। তবে মুসল্লির সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ১৯৯০ সালের পর মসজিদের পরিসর বাড়ানো হয়। বর্তমানে প্রতি ওয়াক্তে অর্ধশতাধিক মানুষ এখানে নামাজ আদায় করেন এবং জুমার দিনে এই সংখ্যা দুই শতাধিক ছাড়িয়ে যায়। স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্যমতে, একসময় আশপাশের পরিবেশ এতটাই জঙ্গলাকীর্ণ ছিল যে বন্য প্রাণীর আতঙ্ক থাকত, যার ফলে মুসল্লিরা পালা করে পাহারা দিয়ে নামাজ আদায় করতেন।

মসজিদটির নামে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমিও রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। পুরোনো রেকর্ডে মুনশি এনায়েতউল্লাহর পক্ষ থেকে এই জমি দানের তথ্য পাওয়া যায়। বর্তমানে এটি কেবল একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, বরং গুরুদাসপুরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন হয়ে উঠেছে। আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও প্রায় চার শতাব্দী ধরে রোদ-বৃষ্টি ও সময়ের ক্ষয় সহ্য করে দাঁড়িয়ে থাকা এই মসজিদটি আজও মুঘল আমলের গৌরবময় ইতিহাসের গল্প শুনিয়ে যাচ্ছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


আমাদের ফেসবুক পেইজ