ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সংঘাত নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। গত সপ্তাহ থেকে দুই পক্ষই একে অপরের ওপর নতুন করে হামলা শুরু করেছে। তবে এই যুদ্ধের ভবিষ্যৎ এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছে। আগামী ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিতব্য মধ্যবর্তী নির্বাচন এই যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন বর্তমানে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। যুদ্ধের তীব্রতা বাড়লে ভোটারদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা নির্বাচনের ফলাফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। এ কারণেই ওয়াশিংটন এখন পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযানের পরিবর্তে অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের কৌশলকে প্রাধান্য দিচ্ছে। গত মাসে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যরত ৬০টি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
এদিকে, হরমুজ প্রণালির আশপাশে ও ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ অব্যাহত রয়েছে, যা তেহরানের তেল রপ্তানিকে বাধাগ্রস্ত করছে। তবে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স যুদ্ধের গুরুত্ব কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করছেন। হোয়াইট হাউসের এক ব্রিফিংয়ে তিনি দাবি করেন, এই মুহূর্তে সক্রিয় কোনো গোলাগুলি চলছে না এবং তিনি একে ‘যুদ্ধ’ হিসেবে আখ্যা দিতে নারাজ। তবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে যে যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল, তা সাত মাসে গড়িয়েছে।
মার্কিন জনমতের ওপর এই যুদ্ধের প্রভাব বেশ স্পষ্ট। রয়টার্স/ইপসোসের গত মাসের শেষ দিকের জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ৩১ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইরান যুদ্ধের পক্ষে, যেখানে ৬৩ শতাংশ এর বিরোধিতা করছেন। সংঘাত শুরুর পর থেকে ট্রাম্পের গ্রহণযোগ্যতা ৪০ শতাংশ থেকে কমে ৩৩ শতাংশে নেমে এসেছে। পলিটিকোর আগস্টের জরিপে দেখা গেছে, ৬১ শতাংশ মার্কিন মনে করছেন, এই যুদ্ধের কারণে তাঁদের পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, যা আগের মাসের তুলনায় ৪ শতাংশ বেশি।
জ্বালানি তেলের দামের ঊর্ধ্বগতি ট্রাম্পের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে, যা ২০২২ সালের আগের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে। অথচ নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্প জ্বালানির দাম কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
বিশ্লেষক ত্রিতা পারসি মনে করেন, ইরানের কর্মকর্তারা ধারণা করছেন যে ট্রাম্প হয়তো মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হওয়ার অপেক্ষায় আছেন, যাতে এরপর বড় পরিসরে সামরিক অভিযান চালানো যায়। পারসি বলেন, ‘এর প্রতিক্রিয়ায় ইরানিরা হয়তো নির্বাচনের ঠিক আগে নিজেরাই দ্রুত যুদ্ধ শুরু করে দিতে পারে, যাতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ওপর সর্বোচ্চ মাত্রার চাপ সৃষ্টি করা যায়।’ তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, নির্বাচনে ট্রাম্পের দলের পরাজয়ে যে পরিস্থিতির আশা তেহরান করছে, বাস্তবে তার বিপরীতও হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তারা পেন্টাগনপ্রধান পিট হেগসেথকে সতর্ক করে জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। গত বুধবার রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হোয়াইট হাউসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা ৩ নভেম্বরের ভোটের পর সামরিক অভিযান জোরদার করার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছেন।
ভ্যান্স গত সপ্তাহে বলেছেন, ‘যেকোনো কিছুই ঘটতে পারে, সবই বিবেচনায় রয়েছে।’ এর মধ্যে অর্থনৈতিক, সামরিক ও গোপন অভিযানসহ নানা ধরনের চাপ প্রয়োগের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত। তবে নেগার মোর্তাজাভি আল-জাজিরাকে বলেছেন, তেহরান অর্থনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না।
ইরান তাদের অসম যুদ্ধে বেশ দক্ষতা দেখিয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার সক্ষমতা তারা প্রমাণ করেছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে, তারা প্রতিরাতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রায় ৩০টি জাহাজ নিরাপদে পার করছে এবং গত মঙ্গলবার প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হয়েছে।
চলতি সপ্তাহে দক্ষিণ ইরানের কুহেস্তায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি হামলায় বেসামরিক বাড়িতে আঘাতের ঘটনা ঘটেছে, যেখানে একটি বিয়ের অনুষ্ঠান চলছিল। এতে শিশুসহ হতাহতের খবর পাওয়া গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ‘যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়’—এমন কৌশল বজায় রাখা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ট্রাম্প প্রশাসন যদি নভেম্বর পর্যন্ত পূর্ণমাত্রার সংঘাত এড়িয়ে চলতে পারে, তবে হয়তো এটি নির্বাচনের প্রধান ইস্যু হয়ে ওঠা আটকানো সম্ভব হবে। তবে তেহরানের পাল্টা জবাবের সম্ভাবনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে সময় যত গড়াচ্ছে, সংঘাতের ওপর একটি বিশেষ তারিখের প্রভাব ততই স্পষ্ট হচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বর্তমানে উভয় কক্ষে সামান্য ব্যবধানে রিপাবলিকানরা এগিয়ে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গত মাসে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করে, বিশেষ করে তাদের তেল কেনে এমন ৬০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পাশাপাশি অন্যান্য দেশকে হুমকি দিয়ে বলেছে, তেহরানের সঙ্গে ব্যবসা করলে তাদেরও যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে ট্রাম্প প্রশাসন কত দিন নিজেদের সংযম ধরে রাখতে পারবে, তা স্পষ্ট নয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কয়েক দিন ধরে মার্কিন বাহিনী ইরানে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মার্কিন নেতারা বলছেন, আরও সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা এখনো রয়েছে।