প্রতিশ্রুতির পরও সৈয়দপুর রেলওয়ে হাসপাতালটি জেনারেল হাসপাতালে রূপান্তর করা হয় নি। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার ফাঁকে পড়েছে ওই প্রতিশ্রুতির প্রকল্পটি। ফলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্হানীয়রা।
তারা বলেন, রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষের সুচিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য একটি সমঝোতা স্মারক স্বক্ষর হয় প্রায় এক বছর আগে। কিন্তু দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। এতে করে স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে চরম ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, ১৮৭২ সালে ৮২ শয্যার এ হাসপাতাল গড়ে তোলা হয় নীলফামারীর সৈয়দপুরে। এক সময়ের রেলওয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারী আর যাত্রীদের চিকিৎসা সেবার ভরসা ছিল সৈয়দপুর রেলওয়ে হাসপাতাল টি। কিন্তু বর্তমানে সেটি ভূতুড়ে বাড়ির মতো। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, সারি সারি শয্যা থাকলেও, নেই চিকিৎসক আর রোগি ! চিকিৎসক ও নার্সসহ চিকিৎসা সেবার সাথে জড়িত মূল জনবল প্রায় শূন্যের কোঠায়।
বিশাল এই হাসপাতালে মঞ্জুরীকৃত চিকিৎসকের পদের বিপরীতে বর্তমানে মাত্র একজন চিকিৎসক কর্মরত আছেন। ফলে একজন চিকিৎসকের পক্ষে বিপুলসংখ্যক রোগীকে প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া নার্স ও টেকনিশিয়ানের সিংহভাগ পদই শূন্য থাকায় এক্স-রেসহ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন অকেজো হয়ে পড়েছে। ২০২০ সালে চিকিৎসক ও কারিগরি পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত হওয়ার পর থেকেই হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম ধীরে ধীরে স্থবির হয়ে পড়ে। বর্তমানে শুধু ভবনটি দাঁড়িয়ে থাকলেও কার্যত এটি একটি সেবাহীন প্রতিষ্ঠান। এতে চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত দেশের বৃহত্তম ও প্রাচীন সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা সংস্লিষ্ট প্রায় ৫ হাজার পরিবার।
সূত্রটি জানায়, এ অচলাস্থা কাটাতে বাংলাদেশ রেলওয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন এ হাসপাতাল যৌথ ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার জন্য ২০২৫ সালের ২১ এপ্রিল রেলপথ মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্য একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়। হাসপাতালটি পরিচালনার জন্য গঠন করা হয় কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটি । ওই কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক হাসপাতালগুলো সুষ্ঠু ও কার্যকর স্বাস্থ্য সেবা দেওয়ার লক্ষ্যে পরবর্তীতে অর্থ বিভাগ, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি ত্রিপক্ষীয় সভাও অনুষ্ঠিত হয়।
সে সময় প্রকল্পটির গুরুত্ব বিবেচনা করে খোদ রেলওয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব হাসপাতালটি সরজমিনে পরিদর্শনও করেছিলেন। ৬৮ লাখ টাকা ব্যায়ে অবকাঠামো সংস্কার কাজও করা হয়। এরপর এক বছর কেটে গেলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। দফায় দফায় ফাইল চালাচালি হলেও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যকার সমন্বয়হীনতায় প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখেনি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে অনিচ্ছুক রেলওয়ের এক কর্মকর্তা জানান, শীর্ষ কর্মকর্তাদের সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও প্রস্তাবনাটি বর্তমানে রেল মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের টেবিলে টেবিলে ঘুরছে। প্রকল্পটি আলোর মুখ আদৌ দেখবে কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। রেলওয়ে শ্রমিক ইউনিয়ন কারখানা শাখার সাধারণ সম্পাদক শেখ রোবায়েতুর রহমান বলেন, চিকিৎসক আধুনিক সুযোগ-সুবিধা না থাকায় সঠিক চিকিৎসা না পেয়ে রংপুর বা দিনাজপুরের দূরবর্তী মেডিকেল কলেজগুলোতে যেতে বাধ্য হচ্ছেন রেলওয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এতে চিকিৎসা ব্যয় ও ভোগান্তি দুটোই বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে তাদের।
সৈয়দপুর সাংগঠনিক জেলা বিএনপির সাধারন সম্পাদক শাহিন আকতার বলেন, এ অঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়াতে এই হাসপাতালটি দ্রুত পূর্ণাঙ্গ জেনারেল রূপে চালু করা অত্যন্ত জরুরি। মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্তারা পরিদর্শনের পরও যদি এক বছর ধরে শুধু কাগজ-কলমেই কাজ আটকে থাকে, তবে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে? অবিলম্বে এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার অবসান ঘটিয়ে হাসপাতালটিকে সবার জন্য উন্মুক্ত করার জোর দাবি জানান তিনি।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলীয় চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা: আনিছুল হক জানান, অন্তর্বতী সরকারের সময় রেলওয়ের ৪ টি হাসপাতালকে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত ও আধুনিকায়ন করার প্রকল্প নেওয়া হয়। ইতিমধ্যে চট্রগ্রাম ও রাজশাহীর রেলওয়ে হাসপাতাল জেনারেলে রুপান্তর করা হয়েছে। সৈয়দপুর রেলওয়ে হাসপাতালটি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ে ফাইল অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। আশা করা হচ্ছে খুব শিগগিরি কার্যকর হবে।
এ নিয়ে কথা হয় জাতীয় সংসদের নীলফামারী-৪ (সৈয়দপুর-কিশোরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিমের সাথে। তিনি বলেন, ইতিমধ্যে বিষয়টি সংসদে উত্থাপন করেছি। সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে খোজ-খবর নিয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান তিনি।