বিদেশে গিয়ে পরিবারের সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন নিয়ে রাশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার খারুয়া ইউনিয়নের খারুয়া গ্রামের আল মামুন (২৪)। কিন্তু ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে কাজ করার কথা থাকলেও তাঁকে পাঠানো হয় সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে। ইউক্রেন সীমান্তে ড্রোন হামলায় তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার পর এখন শোকে স্তব্ধ তাঁর পরিবার। মামুন মৃত আবুল কাশেম ও রোকেয়া খাতুন দম্পতির একমাত্র ছেলে ছিলেন। তিনি স্ত্রী, এক ছেলে ও পাঁচ মাসের এক শিশুকন্যাকে রেখে চলতি বছরের ৭ মে দেশ ছাড়েন।
মামুনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ঝিনাইদহের রাজন হোসেন, যিনি একই এজেন্সির মাধ্যমে মামুনসহ ৩০ জনের দলের সঙ্গে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন। রাজন জানান, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে ইউক্রেনীয় বাহিনীর ড্রোন হামলায় মামুন নিহত হন। এর আগে আহত অবস্থায় রাশিয়া থেকে পালিয়ে গত ২৩ আগস্ট দেশে ফেরেন রাজন। তাঁর ভাষ্যমতে, তাঁদের সঙ্গে একই ফ্লাইটে যাওয়া ৩০ বাংলাদেশির মধ্যে অন্তত ১৭ জন যুদ্ধে যোগ দেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই প্রাণ হারিয়েছেন।
মামুনের স্ত্রী মহিমা আক্তারের অভিযোগ, ইলেকট্রিক কাজের প্রলোভন দেখিয়ে দালালেরা প্রতারণা করে মামুনসহ ৩০ বাংলাদেশিকে রুশ সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেয়। রাশিয়া যাওয়ার পর থেকে স্বামীর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ কমে গিয়েছিল। সর্বশেষ ১৯ আগস্ট অডিও বার্তার মাধ্যমে মামুন জানিয়েছিলেন যে, তাঁর মাথার ওপর ড্রোন উড়ছে এবং তিনি চরম আতঙ্কের মধ্যে আছেন। এরপর থেকেই তাঁর সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, মামুনকে রাশিয়ায় পাঠানোর জন্য প্রায় সাড়ে আট লাখ টাকা খরচ করতে হয়েছে। এর মধ্যে ৫০ হাজার টাকা এনজিও ঋণ, প্রায় ৪ লাখ টাকা ধানের ওপর দাদন এবং বাকি টাকা গরু বিক্রি ও আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার করে জোগাড় করা হয়েছিল। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে এখন ঋণের বোঝা আর সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দিশেহারা মা রোকেয়া খাতুন ও স্ত্রী মহিমা আক্তার।
ঘটনার নেপথ্যে ‘জাবাল-এ নূর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড’ নামের একটি এজেন্সির সম্পৃক্ততার কথা জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। রাজন হোসেন জানান, ৭ মে রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর ১২ মে তাঁদের রুশ ভাষায় একটি চুক্তিতে সই করানো হয়। ভাষা না বোঝায় তাঁরা বুঝতে পারেননি যে সেটি ছিল সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার চুক্তি। এরপর তাঁদের সেনাক্যাম্পে প্রশিক্ষণ দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। ১৪ জুন সম্মুখ সমরে ড্রোন ও মাইন বিস্ফোরণে ১৭ জন বাংলাদেশি নিহত হন এবং রাজন নিজে আহত হন।
মামুনের খালা-শাশুড়ি মোসাম্মৎ কোবিলা আক্তার জানান, দুই বছর আগে থেকেই এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তাঁরা। রাশিয়ায় যাওয়ার পর চুক্তির বিষয়টি জানতে পেরে তাঁরা প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করেছিলেন, কিন্তু সেখান থেকে কেবল আশ্বাসের বাণীই পাওয়া গেছে। এখন তাঁরা ওই এজেন্সির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাতেমা জান্নাত জানান, মামুনের মৃত্যুর বিষয়টি পরিবার মৌখিকভাবে তাঁকে জানিয়েছে। পরিবারকে লিখিত আবেদন জমা দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আবেদন পাওয়ার পর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের প্রবাসী কল্যাণ শাখার মাধ্যমে বিষয়টি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে এবং পরবর্তী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু সেই স্বপ্ন ভেঙে এখন শুধু লাশ ফেরত চাওয়ার আকুতি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: স্ত্রীকে বলেছিলেন ‘আমার প্রমোশন হইছে’, মাস শেষ হওয়ার আগেই রাশিয়ায় বিস্ফোরণে মৃত্যু। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে মামুন মুঠোফোনে অডিও বার্তা ও ছবি পাঠিয়ে যোগাযোগ রাখতেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী বলেছিল, তাঁর মাথার ওপর দিয়ে ড্রোন ঘুরছে, কখন কী ঘটে বলা যায় না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সন্তানদের দেখে রাখার কথাও বলেছিলেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এখন আমি কীভাবে সংসার চালাব, বুঝতে পারছি না।’। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার একমাত্র ছেলে বিদেশ গেছিল নিজের ভাগ্য বদলানোর জন্য, আমাদের ভালো রাখার জন্য। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: নাতি-নাতনিদের কীভাবে বড় করব, জানি না।’।