শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৩২ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
হাইকোর্টের স্থিতাবস্থা আদেশের পরও মোহাম্মদপুরের জনতার বাজারে তালা, অভিযোগ উদ্যোক্তাদের জামালপুরে মিটার সংযোগ ছাড়াই গ্রাহকের নামে বিদ্যুৎ বিল, এলাকায় তোলপাড় বদলি হলেন ‘ভালো হয়ে যাও মাসুদ’ খ্যাত বিআরটিএ কর্মকর্তা মো. মাসুদ আলম দুই দিনের সফরে নিজ জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে যাচ্ছেন রাষ্ট্রপতি নারী জুনিয়র এশিয়া কাপ হকিতে চাইনিজ তাইপেকে উড়িয়ে বাংলাদেশের দুর্দান্ত জয় ২০৭৮ কোটি টাকার আলেকসান্দার ইসাকের ফর্মে ফেরা: লিভারপুলের জয়ে জোড়া গোল কিশোরগঞ্জে বরযাত্রীর গাড়ি আটকে মিষ্টির টাকা দাবি, সংঘর্ষে আহত অর্ধশতাধিক ওষুধের মতো কাজ করছে আমাদের লংমার্চ, চাঁদাবাজদের ছাড় দেওয়া হবে না: ডা. শফিকুর রহমান আগামী পাঁচ দিন দেশজুড়ে বৃষ্টি ও বজ্রসহ বৃষ্টির পূর্বাভাস সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে: শিমরাইলে লংমার্চে জামায়াত আমীর

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের অনন্য উদ্ভিদ রামবাসক: পরিচিতি ও ঔষধি গুণাগুণ

প্রতিবেদকের নাম

চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত নৈসর্গিক সৌন্দর্যমণ্ডিত লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে ভ্রমণের সুযোগ হয়েছিল। উদ্যানের প্রধান ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে সোজা পথ ধরে হাঁটার সময় প্রকৃতির এক অপরূপ রূপ চোখে পড়ে। পথের দুই ধারে সারি সারি নানা প্রজাতির গাছপালা যেন এক প্রশান্তির আবেশ তৈরি করে। বনের ভেতরে কিছুটা এগোতেই চোখে পড়ে রেললাইন, যার পাশেই একটি নামফলকে লেখা রয়েছে যে, নন্দিত নাট্যকার ও ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ‘আমার আছে জল’-এর দৃশ্য ধারণ করা হয়েছিল এই স্থানে।

সেখান থেকে সামনে এগিয়ে পথের ডান পাশে একতলা একটি আধা পাকা দালানের কাছে নগ্নবীজি জাতীয় বিরল বাঁশপাতাগাছের দেখা মেলে। এর পাতাগুলো বাঁশের মতো হওয়ায় এমন নামকরণ করা হয়েছে। আরও সামনে একটি ছোট মোড়ে পৌঁছালে চোখে পড়ে ১৯৫৫ সালে নির্মিত বিখ্যাত হলিউড চলচ্চিত্র ‘অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইটি ডেজ’-এর শুটিংয়ের স্মৃতিফলক। এই মোড় পেরিয়ে বন কর্মকর্তার বাসভবনের পাশ দিয়ে আঁকাবাঁকা পথ চলে গেছে স্থানীয় খাসিয়াপল্লির দিকে। সেই পথের বাঁ পাশেই হঠাৎ নজরে আসে লাল রঙের নান্দনিক ফুলে ভরা একধরনের গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ, যা রামবাসক বা লাল বাসক নামে পরিচিত।

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশের বনে-জঙ্গলে এই উদ্ভিদের দেখা মেলে। বিশেষ করে সিলেটের বনাঞ্চল ও লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের সবুজ গভীরে এই মনোহর গুল্মটি জন্মে। এর বৈজ্ঞানিক নাম Phlogacanthus thyrsiformis এবং এটি Acanthaceae পরিবারের একটি বহুবর্ষজীবী শাখা-প্রশাখাযুক্ত উদ্ভিদ। গাছটি সাধারণত ৩ থেকে ৪ মিটার পর্যন্ত উঁচু এবং ঝোপালো আকৃতির হয়ে থাকে। তবে ভারতের গাড়োয়াল অঞ্চলের মতো কিছু এলাকায় এটি ৬ থেকে ৭ ফুট পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।

রামবাসকের পত্রবিন্যাস বিপরীতমুখী এবং এর পাতাগুলো বেশ বড় ও উপবৃত্তাকার, যা দৈর্ঘ্যে প্রায় ২০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। পাতার উভয় প্রান্ত সূক্ষ্ম এবং কিনারা কখনো কখনো দাঁতের মতো খাঁজকাটা থাকে। এই উদ্ভিদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো এর নলাকার লালচে ফুল, যা ৪ দশমিক ৫ থেকে ৫ সেন্টিমিটার লম্বা হয়ে থাকে। পাঁচটি পাপড়ি যুক্ত হয়ে গঠিত এই ফুলের নিচের ঠোঁট তিন খণ্ডে এবং ওপরের ঠোঁট দুই খণ্ডে বিভক্ত। ফুলের গড়ন হাঁ-করা সিংহমুখের মতো হওয়ায় একে ‘সিংহাস্য’ এবং পুষ্পদণ্ড সিংহের লেজের মতো দেখায় বলে একে ‘সিংহপুচ্ছ’ও বলা হয়। ইংরেজিতে একে ‘Curved-Flower Flame-Acanthus’ নামে ডাকা হয়।

বিভিন্ন অঞ্চলে এই উদ্ভিদটি নানা নামে পরিচিত। আমাদের পরিচিত বাসক ও রামবাসক একই পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। রামবাসকের অনন্য তিতা স্বাদের কারণে অনেকে একে ‘তিতাফুল’ বা ‘লাল বাসক’ বলে থাকেন। ভারতের মণিপুরি সম্প্রদায়ের কাছে এটি ‘নংমাংখা আসিনবা’ নামে অত্যন্ত সুপরিচিত। বাংলাদেশ ছাড়া উত্তর ভারত, চীনের ইউনান, ভুটান, লাওস, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের পাহাড়ি অঞ্চল, ঝোপঝাড় ও নদীর পাড়ে এটি প্রচুর পরিমাণে জন্মে।

ভেষজ চিকিৎসায় রামবাসকের ভূমিকা অপরিসীম। গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ বাসকগাছের মতোই এটি ঠান্ডা-কাশি, অ্যাজমা, হুপিং কাশি ও রক্তপিত্তের মতো সমস্যা উপশমে দারুণ কার্যকর। মণিপুরে জ্বর ও কফ থেকে আরোগ্য লাভের জন্য এর পাতা সেদ্ধ করে চায়ের মতো পান করার ঐতিহ্য রয়েছে। তবে যেকোনো ভেষজ চিকিৎসায় এর সঠিক মাত্রা জেনে ব্যবহার করা জরুরি। প্রথাগত ব্যবহারের বাইরেও বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ একে খাবারের অংশ হিসেবে গ্রহণ করে। মণিপুরে এর তাজা ও ভেজে নেওয়া ফুল স্বাস্থ্যকর টনিক হিসেবে খাওয়া হয় এবং অরুণাচল প্রদেশের অধিবাসীরা এর ফুল পিষে সুস্বাদু মসলা হিসেবে রান্নায় ব্যবহার করেন। প্রকৃতির এই রূপসী ও কার্যকর ভেষজ উদ্ভিদটি বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য ও লোকায়ত চিকিৎসার এক অমূল্য সম্পদ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


আমাদের ফেসবুক পেইজ