বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৫৯ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কিশোরীর বিয়ে নিয়ে সংঘর্ষে আহত ১০ গাজীপুরে বাবার মৃত্যু: পলাতক তরুণ আটক, স্থানীয়দের দাবি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী: ‘ক্রসফায়ারের’ ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স, আইজিপির বক্তব্য ঠিক হয়নি ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় ৫ লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে আইইডিসিআর পরিচালকের কার্যালয়ে ঢুকে মারধরের অভিযোগ ড্যাবের বিরুদ্ধে শিক্ষক থেকে শিক্ষার্থী: যুক্তরাজ্যে উচ্চশিক্ষার অভিজ্ঞতায় মিঞা মহসিন ৩১ অক্টোবর থেকে শুরু মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা ঢাকায় কার্যালয় খোলার প্রস্তাব জাপানের ব্যাংক গভর্নরকে প্রধানমন্ত্রীর পায়রায় গমের সাইলো নির্মাণে রাশিয়াকে প্রস্তাব খাদ্যমন্ত্রীর শক্তিশালী ডানপন্থি সরকার গঠনের ডাক নেতানিয়াহুর

শিক্ষক থেকে শিক্ষার্থী: যুক্তরাজ্যে উচ্চশিক্ষার অভিজ্ঞতায় মিঞা মহসিন

প্রতিবেদকের নাম

দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় শিক্ষকতা, প্রশিক্ষণ ও শিক্ষার্থীদের একাডেমিক সহায়তার সঙ্গে যুক্ত থাকার পর, বর্তমানে নতুন পরিচয়ে নিজেকে আবিষ্কার করছেন মিঞা মহসিন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা এই বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা ২০১১ সালে কর্মজীবন শুরু করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর শেষে ২০১১ সালে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে যোগদানের পর থেকে বাংলাদেশের তিনটি সরকারি কলেজে (মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর; ব্রজলাল কলেজ, খুলনা ও খুলনা সরকারি কলেজ) জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক স্তরে শ্রেণি পাঠদানে যুক্ত ছিলাম।

তিনি মাইকেল মধুসরদন কলেজ (যশোর), ব্রজলাল কলেজ (খুলনা) এবং খুলনা সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেছেন। এছাড়া মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, আঞ্চলিক লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকারের পাঁচটি শিক্ষা প্রজেক্টে শিক্ষক প্রশিক্ষণে মাস্টার ট্রেইনার হিসেবে কাজ করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের পাশাপাশি স্বনির্ভর অধ্যয়ন, প্রবন্ধ, প্রতিফলনমূলক দিনলিপি, পোর্টফোলিও, উপস্থাপনা, নীতিমালাবিষয়ক বিতর্ক, প্রকল্প প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন ধরনের মূল্যায়ন রয়েছে।

তবে ২০২৬ সালের জানুয়ারি শিক্ষাবর্ষে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব দ্য ওয়েস্ট অব স্কটল্যান্ডের (ইউডব্লিউএস) লন্ডন ক্যাম্পাসে ‘মাস্টার অব এডুকেশন ইন এডুকেশনাল স্টাডিজ’ কোর্সে ভর্তি হওয়ার পর থেকে তার দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘ সময় শিক্ষকতার পর শিক্ষার্থীর আসনে বসার অভিজ্ঞতা তাকে নতুন করে নিজের সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাবনাগুলো দেখার সুযোগ করে দিয়েছে। তারপরও বড় শ্রেণি, সময়ের সীমাবদ্ধতা, পরীক্ষাকেন্দ্রিক মূল্যায়নসহ নানা বাস্তবতায় শিক্ষককেন্দ্রিক শিক্ষার প্রভাব অনেক জায়গায় রয়ে গেছে।

মিঞা মহসিনের মতে, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় একজন শিক্ষককে জ্ঞানের প্রধান উৎস হিসেবে দেখা হয়। সেখানে শিক্ষার্থী মূলত শিক্ষকের লেকচার শোনার ওপর গুরুত্ব দেয়। কিন্তু যুক্তরাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে শিক্ষার্থীকে নিজের পড়াশোনার দায়িত্ব নিজেই নিতে হয়। শিক্ষক ক্লাসে তত্ত্ব বা ধারণা উপস্থাপন করেন, যা পরবর্তী গবেষণার সূচনা মাত্র। এরপর শিক্ষার্থীকে বই, গবেষণাপত্র ও বিভিন্ন নীতিমালা বিশ্লেষণ করে নিজস্ব একাডেমিক যুক্তি তৈরি করতে হয়।

যুক্তরাজ্যের শ্রেণিকক্ষে প্রশ্ন করার সংস্কৃতি তাকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে। সেখানে দ্বিমত পোষণ বা গবেষণার সীমাবদ্ধতা নিয়ে শিক্ষকের সঙ্গে যুক্তি-তর্ক করা একটি স্বাভাবিক বিষয়। বিষয়টিকে ব্যক্তিগত অসম্মান হিসেবে না দেখে একাডেমিক আলোচনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এমনকি কোনো গবেষণাপদ্ধতি নিয়েও শিক্ষার্থীরা গঠনমূলক প্রশ্ন তুলতে পারে, যা শেখার পরিধিকে আরও বিস্তৃত করে। শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের বক্তব্য শোনে, নোট নেয় এবং পরীক্ষায় তা যথাসম্ভব সঠিকভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে।

শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের বিষয়ে মিঞা মহসিন জানান, বাংলাদেশে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে যে সামাজিক দূরত্বের জায়গা রয়েছে, তার বাইরে গিয়েও যে সম্মান বজায় রেখে संवाद করা সম্ভব, তা তিনি যুক্তরাজ্যে এসে উপলব্ধি করেছেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, সেখানে ঈদের দিনেও ক্লাস হয়েছে এবং এ নিয়ে শিক্ষকের কাছে প্রশ্ন করার সুযোগ ছিল। শিক্ষকরাও দ্বিমতকে গুরুত্বের সঙ্গে শোনেন, যা শিক্ষার পরিবেশকে প্রাণবন্ত করে তোলে। বাংলাদেশে শিক্ষকতা করার সময় আমার দায়িত্বের একটি বড় অংশ ছিল শিক্ষার্থীদের বিষয়বস্তু বোঝানো, প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এবং পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সহায়তা করা।

যুক্তরাজ্যে পড়ার আরেকটি বড় দিক হলো বৈচিত্র্যময় পরিবেশ। বিভিন্ন দেশ, সংস্কৃতি ও বয়সের শিক্ষার্থীদের একই শ্রেণিকক্ষে পাওয়ায় শেখার প্রক্রিয়ায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। প্রতিটি শিক্ষার্থীর জীবন-অভিজ্ঞতা ভিন্ন হওয়ার কারণে একই বিষয়ের ওপর ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা পাওয়া যায়, যা শুধু বইয়ের তথ্যের ওপর নির্ভরশীল থাকাকে অপ্রাসঙ্গিক করে তোলে। একটি ভালো লিখিত কাজে শুধু ‘কী ঘটেছে’ তা বললেই হয় না।

মূল্যায়নপদ্ধতির ক্ষেত্রেও তিনি বড় ধরনের পার্থক্য পেয়েছেন। শুধু ঘটনাপ্রবাহ বর্ণনা নয়, বরং কেন এবং কীভাবে একটি বিষয়ের উদ্ভব হলো, বিভিন্ন গবেষকের মতামতের মধ্যে মিল-অমিল কোথায় এবং নিজের বিশ্লেষণ কী—এসবের ভিত্তিতে একাডেমিক লেখা তৈরি করতে হয়। এই প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থী নিজের চিন্তা গুছিয়ে নিতে বাধ্য হয়, যা পেশাগত জীবনেও সহায়ক। উত্তরটি কীভাবে তৈরি হলো, এর পেছনে কী প্রমাণ রয়েছে এবং ভিন্নমতের সঙ্গে সেটির সম্পর্ক কী—এসবও গুরুত্বপূর্ণ। দুই শিক্ষাব্যবস্থার পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে মূল্যায়নপদ্ধতিও গুরুত্বপূর্ণ।

দীর্ঘ সময় শিক্ষকতার পর পড়াশোনায় ফেরার উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, এটি কেবল একটি নতুন ডিগ্রি অর্জন নয়। দীর্ঘদিনের অভ্যাস ও শিক্ষাদান পদ্ধতির মধ্যে অনেক সময় জড়তা চলে আসে। নতুন পরিবেশে শিক্ষার্থী হিসেবে পড়াশোনা করা সেই জড়তা কাটিয়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরিতে সাহায্য করেছে। তার উপলব্ধি, শিক্ষক হওয়া মানেই শেখা শেষ হয়ে যাওয়া নয়, বরং একজন ভালো শিক্ষককে সারা জীবন শিক্ষার্থীর অবস্থানে থাকতে হয়। এবার নিজেকেই সেই প্রক্রিয়ার মধ্যে যেতে হচ্ছে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক যে বিষয়টি আলোচনা করলেন, সেটিই শেষ কথা নয়।

বিদেশে উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তার পরামর্শ হলো, কেবল দেশ নির্বাচন করাই যথেষ্ট নয়। কেন পড়তে চান, ক্যারিয়ারের লক্ষ্য কী এবং কোন বিশ্ববিদ্যালয় ও বিষয় তার জন্য মানানসই—তা আগে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল কোনো পোস্ট দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ওয়েবসাইট থেকে তথ্য যাচাই করে নেওয়ার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেছেন।

পরিশেষে, তিনি মনে করেন, কোনো শিক্ষাব্যবস্থাই ত্রুটিমুক্ত নয়। আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের কঠোর পরিশ্রমের ক্ষমতা ও সীমিত সম্পদের মধ্যে টিকে থাকার যে শক্তি আছে, তা অনেক ক্ষেত্রেই বৈশ্বিক মানের। ভবিষ্যতে যখন তিনি পুনরায় শিক্ষার্থীর সামনে দাঁড়াবেন, তখন শুধু শেখানোর মানসিকতা নয়, বরং তাদের কাছ থেকেও নতুন কিছু শেখার আগ্রহ নিয়ে পাঠদান করবেন বলে তিনি জানান। এই অভিজ্ঞতা আমাকে শুধু নতুন কিছু শেখায়নি; বরং এতদিনের শিক্ষকতাকেও নতুন চোখে দেখতে শিখিয়েছে। অবশ্যই দেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখন শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক ও অংশগ্রহণমূলক শিক্ষাদানের চর্চা বাড়ছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


আমাদের ফেসবুক পেইজ