শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:১৯ অপরাহ্ন
শিরোনাম :

নতুন শিক্ষাক্রমের অংশ হিসেবে যুক্ত হচ্ছে চারটি পাঠ্যবই

প্রতিবেদকের নাম

দেশের প্রচলিত মুখস্থনির্ভর ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে নতুন চারটি পাঠ্যবই অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের আনন্দময়, বাস্তবমুখী ও কর্মদক্ষ করে গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ১৫ বছরের রূপকল্প, বহুমুখী গবেষণা ও নির্দেশনার আলোকে এনসিটিবি নতুন এই পাঠ্যবইগুলো প্রণয়ন করেছে। দেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার গতানুগতিক মুখস্থবিদ্যা ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক মানসিকতা থেকে শিক্ষার্থীদের বের করে এনে আরও বেশি আনন্দময়, জীবনমুখী ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দক্ষ করে গড়ে তুলতে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের দুই শ্রেণিতে যুক্ত হচ্ছে নতুন চারটি। এর অধীনে এনসিটিবি একটি টিম গঠন করে, যেখানে এসব পলিসি প্রণয়নে যারা প্রধানমন্ত্রীকে সহযোগিতা করেছেন, তাদেরকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই নতুন পাঠ্যপুস্তক বদলে দেবে নতুন প্রজন্মের শিখন পদ্ধতি ও অভিজ্ঞতা।

শিক্ষাকে আনন্দদায়ক ও নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন করার এই উদ্যোগ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বলেন, রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তনের পরিকল্পনা করেছেন। এরই অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় সংস্কারে মনোনিবেশ করেন।

দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও গবেষণার বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই পাঠ্যক্রমে এই নতুন বইগুলো যুক্ত করা হচ্ছে।

উপদেষ্টা আরও জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় গঠিত এনসিটিবির বিশেষজ্ঞ টিম এবং বরেণ্য শিক্ষাবিদদের পরামর্শে এই পলিসিগুলো বাস্তবায়িত হচ্ছে, যার লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিক গুণাবলি ও কর্মসংস্থানের উপযুক্ত দক্ষতা তৈরি করা। তিনি আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সাথে গত ১৫ বছর এ বিষয়ে আমি নিজে কাজ করে যেটা বুঝেছি— উনি চান শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মাঝে মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক শিষ্টাচার, পারিবারিক সংস্কৃতি ও সুনাগরিকের গুণাবলি তৈরি হবে। যার কারণে নির্বাচনে জয়ী হয়ে আসার পর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় এই কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার জন্য এনসিটিবিকে সম্পৃক্ত করা হয়। পাশাপাশি আরও অনেক বরেণ্য শিক্ষাবিদ আছেন, যারা বিভিন্ন পর্যায়ে শিক্ষা কার্যক্রমের সাথে জড়িত; তারা প্রধানমন্ত্রীর রূপকল্পটাকে বাস্তবায়নের জন্য ধারাবাহিকভাবে কনসালটেশন এবং মিটিং করেন।’। এনসিটিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই বইয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারবে— শেখা শুধু মুখস্থ করা বা পরীক্ষার প্রস্তুতির বিষয় নয়; বরং নিজের জীবন, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, নিরাপত্তা, সৃজনশীলতা, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং দৈনন্দিন অভি। এতে শিক্ষার্থীরা নিজ স্বাস্থ্য, চারপাশের পরিবেশ ও দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার আলোকেই আনন্দঘন উপায়ে শিখন ফল অর্জনে সক্ষম হবে।

আগামী ২৫ অক্টোবর জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসি) সভায় এই চারটি বইয়ের চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার কথা রয়েছে। এনসিটিবির চেয়ারম্যান প্রফেসর মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা জানিয়েছেন, পাণ্ডুলিপি ও ভ্যালিডেশনের কাজ ইতোমধ্যে সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। অনুমোদন পাওয়ার পরপরই প্রায় দেড় কোটি কপি বই মুদ্রণের জন্য প্রেসে পাঠানো হবে। এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) প্রফেসর মোহাম্মাদ আবু নাসের টুকু জানান, আগামী ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে মুদ্রণ কার্যক্রম শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এনসিটিবি জানিয়েছে, চারটি বইয়ের প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ কপি বই মুদ্রণ করা হবে। ২৫ অক্টোবর এনসিসির সভায় অনুমোদনের পরই কন্টেন্টগুলো মুদ্রণের জন্য প্রেসে পাঠানো হবে।’। এনসিটিবি জানায়, গত ১২ জুলাই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে চার মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের কর্মশালায় বইগুলোর রূপরেখা উপস্থাপনের পর বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদদের সমন্বয়ে চূড়ান্ত পাণ্ডুলিপি তৈরি করা হয়।

চতুর্থ শ্রেণির জন্য তৈরি করা হয়েছে ‘খেলাধুলা’ ও ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ নামক দুটি বই। ‘খেলাধুলা’ বইটিতে ১৪টি অধ্যায়ে ফুটবল, ক্রিকেট, সাঁতার ও অ্যাথলেটিকসসহ বিভিন্ন খেলার নিয়মাবলী তুলে ধরা হয়েছে।

এছাড়া আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবে কারাতে, জুডো ও তায়কোয়ান্দোর প্রাথমিক নিয়মাবলীও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আত্মরক্ষার কৌশল শেখাতে কারাতে, জুডো ও তায়কোয়ান্দোর মতো আত্মরক্ষামূলক কৌশল স্থান পেয়েছে।

বইটির প্রথম অধ্যায়ে ‘স্বপ্ন যখন আকাশ ছোঁয়া’ শিরোনামে একটি বাস্তবধর্মী গল্প রয়েছে, যেখানে প্রত্যন্ত গ্রামের শিক্ষার্থীদের এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা তুলে ধরা হয়েছে। যেখানে একটি প্রত্যন্ত গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আয়মান স্যার ও তার সহকর্মী সাদিয়া আপার হাত ধরে মেয়েদের ফুটবল দল গঠনের প্রেরণার গল্প ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

ইনজুরি মোকাবিলায় প্রাথমিক চিকিৎসার কৌশলও এখানে হাতে-কলমে শেখানো হবে।

‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ বইটিতে ১১টি অধ্যায়ে দেশের লোকজ ঐতিহ্য, পোশাক, শিল্পকলা এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবনধারা তুলে ধরা হয়েছে। এতে পারিবারিক সহযোগিতা ও সামাজিক শিষ্টাচারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ অধ্যায় হিসেবে ১৯৭৬ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে চালু হওয়া প্রতিভা অন্বেষণমূলক আয়োজন ‘নতুন কুঁড়ি’র ইতিহাস ও বিজয়ীদের দুর্লভ ছবি সংযুক্ত করা হয়েছে। শুধু খেলাই নয়; এতে পুষ্টি, সামাজিক দক্ষতা ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সামাজিক বাধা ও কুসংস্কার পেরিয়ে মেহজাবিনসহ একাধিক শিক্ষার্থী ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও বিভাগ পেরিয়ে জাতীয় পর্যায়ে বিজয়ী হওয়ার গল্প দিয়ে এতে দেখানো হয়েছে কীভাবে খেলাধুলা শরীর সুস্থ রাখার পাশাপাশি পেশা হিসেবে আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ঘটাতে। বইটিতে বাংলা বর্ণমালা চর্চা, বিদ্যালয় উৎসব, জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও পিঠা-পুলির মেলবন্ধনের পাশাপাশি বাবা-মায়ের যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও গৃহস্থালির পারস্পরিক সহযোগিতার আধুনিক রূপ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

মাধ্যমিক স্তরের ষষ্ঠ শ্রেণির জন্য প্রণয়ন করা হয়েছে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ ও ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ বই দুটি। ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বইটিতে ৬টি অধ্যায়ের মাধ্যমে শিক্ষার ভীতি দূর করে পরিবেশ ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে শেখার কৌশল শেখানো হবে। অন্যদিকে, ৮টি অধ্যায়ে বিন্যস্ত ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ বইটির মূল উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করা, যা একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহায়ক হবে। এনসিটিবি সংশ্লিষ্টরা জানান,সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী আনন্দ, খেলাধুলা, সংস্কৃতির মেলবন্ধন এবং হাতে-কলমে কারিগরি দক্ষতানির্ভর পাঠ্যপুস্তক প্রণীত হয়েছে। ১৪টি গতিশীল অধ্যায়ে সাজানো এই বইটির মূল উদ্দেশ্য শিশুদের শৈশব থেকেই সুস্থ জীবনধারা ও ক্রীড়াচর্চায় আগ্রহী করে তোলা। এছাড়া খেলার মাঠে বা দৌড়ানোর সময় কেটে যাওয়া, মচকানো, নাক দিয়ে রক্ত পড়া বা হিট স্ট্রোকের মতো পরিস্থিতিতে করণীয় বাস্তবসম্মত ছবির মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এ বিষয়ে এনসিটিবি চেয়ারম্যান বাসস’কে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা যাতে একমুখী ও ক্লান্তিকর না হয়ে ওঠে, সেদিকে বিশেষ নজর রেখে ‘খেলাধুলা’ বইটি প্রথমবারের মতো প্রণয়ন করা হয়েছে।’।

শিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন আরও জানিয়েছেন, বর্তমানে চতুর্থ শ্রেণি থেকে ক্রীড়া ও সংস্কৃতি বিষয়ক শিক্ষা শুরু হলেও পর্যায়ক্রমে এটি প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সম্প্রসারিত করা হবে। এই পাঠ্যপুস্তকগুলোর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা পুঁথিগত বিদ্যার সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে বাস্তব জীবনে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


আমাদের ফেসবুক পেইজ