শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৪৭ অপরাহ্ন

মুরগি ও ডিমের বাজারে খামারি বনাম খুচরা মূল্যের বিস্তর

প্রতিবেদকের নাম

রাজধানীর খুচরা বাজারে ব্রয়লার মুরগি ও ডিমের দাম আকাশচুম্বী হলেও এর সুফল পাচ্ছেন না প্রান্তিক খামারিরা। বরং উৎপাদন খরচ বাড়ার সাথে বিক্রয়মূল্যের বড় ব্যবধানের কারণে লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের। বর্তমানে ঢাকার বাজারে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৯০ টাকায় বিক্রি হলেও খামারিরা তা বিক্রি করছেন মাত্র ১৩৪ টাকা কেজি দরে। এতে কেজিপ্রতি খামার ও খুচরা বাজারের দামের পার্থক্য দাঁড়াচ্ছে ৫৬ টাকা।

খামারি শাফিউর রহমানের মতে, বর্তমান বাজারে উৎপাদন খরচ ব্যাপক হারে বেড়েছে।

গত দুই মাসে ব্রয়লার মুরগির খাবারের দাম বস্তাপ্রতি ২২৫ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে ৩ হাজার ৭৮৫ টাকায় ঠেকেছে। পাশাপাশি ওষুধের খরচও বেড়েছে। শাফিউর রহমান জানান, ১ হাজার ২০০ মুরগির একটি চালানের প্রায় ১ হাজারটি বিক্রি করেও তাঁর ৫০ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে। বাকি মুরগির কিছু মারা গেছে এবং ৭০টি এখনো খামারে রয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে চলতি মূলধন হারিয়ে খামার কার্যক্রম চালানো অসম্ভব হয়ে পড়বে বলে তিনি আশঙ্কা করছেন। উৎপাদন খরচ তুলতে না পেরে এক চালানেই প্রায় ৫০ হাজার টাকা লোকসানের কথা জানিয়েছেন এক খামারি। বাকি মুরগির কিছু মারা গেছে, আর প্রায় ৭০ কেজি মুরগি এখনো খামারে রয়েছে। একাধিক চালানে এমন লোকসান হলে খামারিদের চলতি মূলধন কমে যেতে পারে। এতে নতুন করে বাচ্চা তোলা, খাবার কেনা এবং খামারের কার্যক্রম চালিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ডিম উৎপাদনকারী খামারিদের অবস্থাও খুব একটা সুবিধাজনক নয়। লেয়ার মুরগির খামারি আরিফুল ইসলাম জানান, বুধবার তিনি প্রতি পিস ডিম ৮ টাকা ৫০ পয়সা দরে বিক্রি করেছেন, যার মানে খামার পর্যায়ে প্রতি ডজন ডিমের দাম পড়ে ১০২ টাকা। অথচ একই দিনে ঢাকার বাজারে প্রতি ডজন লাল ফার্মের ডিম বিক্রি হয়েছে ১৫৫ টাকায়। অর্থাৎ খামার ও বাজারের মধ্যে দামের ব্যবধান এখন ৫৩ টাকা। গত বুধবার (২১ অক্টোবর) ঢাকার বাজারে প্রতি ডজন লাল ডিম বিক্রি হয়েছে ১৫৫ টাকায়। খাবারের কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধিই কি এর প্রধান কারণ, নাকি সরবরাহব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাবও দামের ব্যবধান বাড়াচ্ছে।

ডিম উৎপাদনেও খরচ বৃদ্ধির চাপ স্পষ্ট। আরিফুল ইসলামের তথ্য অনুযায়ী, বাজারে পোলট্রি খাবারের বস্তাপ্রতি দাম ৩২৫ টাকা বেড়ে ২ হাজার ৯০০ টাকা ছাড়িয়েছে। তিনি জানান, ডিম বিক্রি করে যে অর্থ পাওয়া যায় তা দিয়ে শুধু উৎপাদন খরচ মেটানোই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ছে।

বাজারের এই অস্থিরতা এবং দামের এই বড় ফারাকের পেছনে সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। ঢাকার মুরগি ব্যবসায়ী আফজাল জানান, কাপ্তান বাজারের সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে মুরগির দাম ওঠানামা করে। সেখানে রাতে এক দামে এবং সকালে অন্য দামে মুরগি কেনাবেচা হয়। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় লাভবান হচ্ছেন মধ্যস্বত্বভোগীরা, আর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন উৎপাদনকারী ও ভোক্তা উভয়ই।

খামারিদের অভিযোগ, মুরগির খাদ্য ও ওষুধের দাম যে হারে বাড়ছে, উৎপাদিত পণ্যের বিক্রয়মূল্য সেই হারে বাড়ছে না। এই ভারসাম্যহীনতা প্রান্তিক পর্যায়ে আর্থিক ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। একইসাথে ভোক্তাদেরও বেশি দামে পণ্য কিনতে বাধ্য হতে হচ্ছে।

পোলট্রি শিল্পের এই সংকট কাটাতে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমানো এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সঠিক তদারকি ছাড়া খামারিদের টিকে থাকা এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে বাজার পরিস্থিতি ধরে রাখা চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছে। ঢাকা পোস্টের বরাতে পাওয়া এই তথ্যগুলো খামারিদের দুরবস্থার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


আমাদের ফেসবুক পেইজ