জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বিনা মূল্যের পাঠ্যবই ছাপানোর প্রক্রিয়ায় নতুন মোড় নিয়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের বই ছাপানোর জন্য আহুত পুনঃ দরপত্রে প্রতিযোগিতা বাড়ায় সরকারের খরচ কমেছে প্রায় ১৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩৪টি লটে প্রাক্কলিত ব্যয়ের তুলনায় ১৪ শতাংশ বা ৯ কোটি ৩৭ লাখ টাকা সাশ্রয় হয়েছে। এছাড়া নতুন চারটি বইয়ের ২৩ লটের মুদ্রণ ব্যয়ে আরও ৪ কোটি ৬০ হাজার টাকা বেঁচে গেছে। আর নতুন চার বইয়ের ২৩ লটে কমেছে আরও সাড়ে ৮ শতাংশ বা ৪ কোটি ৬০ হাজার টাকা। ঠিকাদারদের প্রস্তাবিত দর অনুযায়ী, ব্যয় কমেছে ৯ কোটি ৩৬ লাখ ৯৯ হাজার ৫৯১ টাকা। সাশ্রয়ের হার প্রায় ১৩ দশমিক ৯৮ শতাংশ। এসব বইয়ের জন্য ২৩ লটে এনসিটিবির বরাদ্দ ছিল ৫৩ কোটি ৯৪ লাখ টাকা।
বিনা মূল্যের বই ছাপাতে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও এবার মূল দরপত্রে প্রতিযোগিতার তীব্র অভাব ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। গত ১৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনের জের ধরে ৬ অক্টোবর এনসিটিবিতে অভিযান চালায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মুদ্রণশিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খানের মতে, সিন্ডিকেটের নেতারা নিজেদের সক্ষমতার বাইরে কাজ বাগিয়ে নিয়েছিলেন, যার ফলে পরের ধাপে এসে সেই সমঝোতা আর টেকেনি।
চলতি বছর বেশ কিছু লটে ঠিকাদাররা যোগ্যতা পূরণ করতে না পারায় অথবা প্রয়োজনীয় নথি জমা না দেওয়ায় ৩৪টি লটে পুনঃ দরপত্র দিতে হয়। এসব লটে ইবতেদায়ি থেকে শুরু করে নবম শ্রেণির বিভিন্ন বই অন্তর্ভুক্ত ছিল। দাপ্তরিক নথি অনুযায়ী, ওই ৩৪ লটের প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৬৭ কোটি ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩৭৮ টাকা, যেখানে ঠিকাদাররা কাজ পাওয়ার জন্য ৫৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকার প্রস্তাব দেন। প্রতিযোগিতার এমন নজির দেখা গেছে ৭৪৫ ও ৯৪৭ নম্বর লটের মতো ক্ষেত্রগুলোতে, যেখানে যথাক্রমে পাঁচজন ও ৩২ জন ঠিকাদার দরপত্র জমা দিয়েছিলেন। লটগুলোর মধ্যে রয়েছে ইবতেদায়ির প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির একটি, ষষ্ঠ শ্রেণির পাঁচটি, সপ্তম শ্রেণির ছয়টি, অষ্টম শ্রেণির দুটি এবং নবম শ্রেণির ২০টি। ৯৪৭ নম্বর লটে প্রতি ফর্মা ২ টাকা ৮৭ পয়সা দর দিয়ে বই ছাপানোর কাজ পায় মহানগর প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশন। প্রতিষ্ঠানটির মালিক গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘আমার লাভ কম হবে। দরপত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এসব লটে ঠিকাদারেরা দর প্রস্তাব করে ৪৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা। তাঁর ভাষায়, ‘স্বাভাবিকভাবেই কোনো টেন্ডারে পুনঃ দরপত্র হলে দর কমে যায়।
এনসিটিবির কর্মকর্তাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মূল দরপত্রেই যদি এমন স্বচ্ছ প্রতিযোগিতা বজায় থাকত, তবে সরকারের আরও অনেক বেশি অর্থ সাশ্রয় হতো।
তাদের হিসাবে, শুধু মাধ্যমিক স্তরের বই ছাপানোর কাজেই প্রায় ২৫৯ কোটি ৪৭ লাখ টাকা সাশ্রয় হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। শুধু মাধ্যমিক স্তরের বই ছাপানোয় প্রায় ২৫৯ কোটি ৪৭ লাখ টাকা সাশ্রয় হতে পারত। তাঁদের বেশির ভাগই ছিলেন ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের।
আগামী শিক্ষাবর্ষে প্রাক-প্রাথমিক থেকে নবম-দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ৩১ কোটি পাঠ্যবই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার মধ্যে ২২ কোটির বেশি বই মাধ্যমিক স্তরের। সব মিলিয়ে বই ছাপার সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। সরকারের লক্ষ্য, বছরের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছে দেওয়া। এ ছাড়া আগামী শিক্ষাবর্ষে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে দুটি করে মোট চারটি নতুন বই যুক্ত হচ্ছে।
পুনঃ দরপত্রে দর কমার বিষয়টি নিয়ে এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) মোহাম্মদ আবু নাসের জানান, এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া এবং মূল দরপত্রের সঙ্গে এর তুলনা করা সঠিক হবে না। তবে মূল দরপত্রে অনিয়ম ও যোগসাজশের অভিযোগের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, বর্তমানে তাদের হাতে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো কোনো সুযোগ নেই। সার্বিক বিষয়ে কথা বলতে এনসিটিবির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ফখরুল মাওলার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।
তবে এনসিটিবির এই অবস্থান মানতে নারাজ ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, গৎবাঁধা কথা বলে দুর্নীতির দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। পুনঃ দরপত্রে খরচ কমার এই প্রবণতা মূলত এনসিটিবির কর্মকর্তাদের সাথে ঠিকাদারদের যোগসাজশেরই প্রমাণ। তাই সরকারের উচিত কেবল মুদ্রণ মালিকদের নয়, এনসিটিবির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।