ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আবাসন সংকট, জ্বালানি তেলের দামের ঊর্ধ্বগতি এবং সরকারি নীতির বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভ চরমে পৌঁছেছে। ফ্রান্স, আলবেনিয়া, ইতালি, স্পেন ও পর্তুগালের বিভিন্ন শহরে হাজার হাজার মানুষ রাজপথে নেমে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। বেশ কিছু জায়গায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, কোথাও আবার টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ ও ধরপাকড়ের মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষের এই ঢেউ ইউরোপজুড়ে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়িয়ে দিয়েছে। প্যারিস, লিয়ঁ, লিল, মার্সেই, মন্টপেলিয়ের, নঁত ও তুলুজে সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। ঘটনাটি আবাসন ব্যয় বৃদ্ধি ও ভাড়াটিয়াদের দুর্বল সুরক্ষাব্যবস্থা নিয়ে দেশজুড়ে ক্ষোভের জন্ম দেয়। পরে সেটি রক্ষায় শত শত মানুষ জড়ো হন।
ফ্রান্সে পরিস্থিতি সবচেয়ে উত্তপ্ত দেখা গেছে।
শনিবার দেশব্যাপী বিক্ষোভে প্রায় ৪ লাখ ১০ হাজার মানুষ অংশ নিয়েছেন, যার মধ্যে প্যারিসেই ছিলেন ১ লাখ ১০ হাজার। সিজিটি শ্রমিক ইউনিয়নের দাবি অনুযায়ী, সারা দেশে বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ছিল ৮ লাখের কাছাকাছি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানিয়েছেন, বিক্ষোভে ‘অত্যন্ত উচ্চমাত্রার সহিংসতার’ ঘটনা ঘটেছে এবং কালো পোশাক পরা উগ্রপন্থীরা পুলিশের দিকে আতশবাজি ও বিভিন্ন বস্তু ছুড়েছে। এ ঘটনায় দেশজুড়ে প্রায় ১ হাজার ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে; যার মধ্যে প্যারিসেই পুলিশের তল্লাশিতে ৬৫ জন আটক হয়েছেন। এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প জর্জিয়ার এক নির্বাচনী সমাবেশে দাবি করেন, অভিবাসন নীতির কারণে ফ্রান্স এখন জ্বলছে এবং অভিবাসীরা দেশটির শিল্প ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয়। ফ্রান্সে প্রায় ১,০০০ গ্রেপ্তার ফ্রান্সে শনিবারের বিক্ষোভ ঘিরে দেশজুড়ে প্রায় এক হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে দিনের অধিকাংশ সময় বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ ছিল বলে জানান তিনি। তবে অন্যতম আয়োজক শ্রমিক ইউনিয়ন সিজিটি দাবি করেছে, দেশজুড়ে বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৮ লাখ, যার মধ্যে রাজধানীতেই ছিলেন ২ লাখ ৫০ হাজার। প্যারিসে তিন হাজারের বেশি মানুষকে থামিয়ে তল্লাশি করা হয়। সেখানে ৬৫ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। এ ধরনের মানুষকে দেশে প্রবেশ করতে না দেয়ার পক্ষে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন তিনি। ইতালির এই বিক্ষোভ বৃহত্তর আন্দোলনের অংশ। বাড়ির মালিক ভাড়া ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দেয়ার পর তাকে বাসা ছাড়তে হয়। তবে হতাহতের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় ট্রাম্পের পরিবারের সংশ্লিষ্ট একটি বিলাসবহুল হোটেল উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ তীব্র আকার ধারণ করেছে। অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলনে তিন শতাধিক বিক্ষোভকারী ও পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ রাবার বুলেট ও টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করেছে। কর্তৃপক্ষ কয়েক ডজন আন্দোলনকারীকে গ্রেপ্তার করেছে এবং সরকারি ভবনে হামলার অভিযোগ তুলেছে। ট্রাম্পের অভিযোগ, ফ্রান্সে যাওয়া কিছু অভিবাসী দেশটিকে পছন্দ করেন না, এমনকি সেখানকার ঐতিহাসিক স্থাপনা ও শিল্পকর্মের প্রতিও তাদের শ্রদ্ধা নেই। আহত হয়েছেন ৩০০ জনের বেশি বিক্ষোভকারী ও পুলিশ সদস্য।
ইতালিতেও বিক্ষোভের মুখে নিরাপত্তাব্যবস্থা কঠোর করা হয়েছে। দেশজুড়ে হাজারো মানুষ আবাসন ব্যয় ও জ্বালানির দাম নিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। পুলিশ বিভিন্ন শহরে সংঘর্ষের পর নয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে এবং ৩৭১ জনকে সাময়িকভাবে আটক করেছে, যাদের মধ্যে ১১০ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক। অন্যদিকে স্পেনের মাদ্রিদে আবাসন সংকটের প্রতিবাদে ‘পুয়ের্তা দেল সোল’ চত্বরে গড়ে উঠেছে তাঁবুর শহর। গত মাসে ৮৭ বছর বয়সী এক নারীকে উচ্ছেদের ঘটনার পর শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন সরকারবিরোধী বড় বিক্ষোভে রূপ নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ আবাসন বিল উত্থাপন করলেও সংসদে অনুমোদন না পাওয়ায় ২৯ নভেম্বর আগাম সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দিতে বাধ্য হন। এ ছাড়া ৩৭১ জনকে সাময়িকভাবে আটক করে থানায় নেয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী মেলোনির সরকার চলতি সপ্তাহের শুরুতে নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও কঠোর করার সিদ্ধান্ত নেয়। ইতালিতে কঠোর নিরাপত্তা, শতাধিক আটক ইতালিতে গত সপ্তাহান্তে সহিংস সংঘর্ষের পর শনিবার দেশজুড়ে বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। শিবিরে রয়েছে খাবার বিতরণের জায়গা, চিকিৎসাকেন্দ্র ও বৈঠকের ব্যবস্থা। গত ২৬ সেপ্টেম্বর ৮৭ বছর বয়সী এক বৃদ্ধাকে দীর্ঘদিনের বাসস্থান থেকে উচ্ছেদের পর আন্দোলনটি শুরু হয়। অন্যথায় আইন অমান্যের অভিযোগে ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি দেয়া হয়।
পর্তুগালের রাজধানী লিসবনের রসিও চত্বরে পুলিশ আবাসনসংকটবিরোধী একটি বিক্ষোভ শিবির উচ্ছেদ করেছে। ২০১৭ সালের পর বাড়িভাড়া দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পাওয়ায় তরুণ প্রজন্মের মধ্যে তীব্র হতাশা তৈরি হয়েছে। রোববার ভোরে পুলিশ কুকুর নিয়ে অভিযান চালিয়ে তাঁবুগুলো সরিয়ে নেওয়া হয় এবং কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিক্ষোভকারীদের দাবি, বাড়িওয়ালাদের উচ্ছেদের ক্ষমতা সহজ করার বিদ্যমান আইন বাতিল করতে হবে এবং ভাড়ার ঊর্ধ্বসীমা নির্ধারণ করতে হবে। ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয়, আলবেনিয়ায় উন্নয়ন প্রকল্প এবং স্পেন ও পর্তুগালে আবাসন সংকট—মূল ইস্যু ভিন্ন হলেও ইউরোপজুড়ে অর্থনৈতিক চাপের মুখে জনঅসন্তোষ দিন দিন বাড়ছে। এতে বিশেষ করে তরুণদের ওপর চাপ বাড়ছে। তাঁবু সরিয়ে নিতে বিক্ষোভকারীদের আগেই সতর্ক করা হয়েছিল।