ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং দেশটির সামরিক বাহিনীর প্রধান ইয়াল জামিরের মধ্যে বড় ধরনের মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। এই বিরোধের মূল কারণ হলো ইরানে সামরিক অভিযান পরিচালনার জন্য নেতানিয়াহুর দেয়া একটি নির্দেশ, যা বাস্তবায়নে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন সেনাপ্রধান জামির। ইসরাইলের টেলিভিশন চ্যানেল ১২-এর প্রতিবেদনে এই তথ্য সামনে আসার পর রাজনৈতিক ও সামরিক অঙ্গনে আলোচনার ঝড় উঠেছে। চ্যানেলটির দাবি, গত ২৪ ঘণ্টায় এই পরিস্থিতি চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে এবং সামরিক সেন্সরশিপ মেনে প্রতিবেদনটি প্রচার করা হয়েছে। সূত্রের বরাতে চ্যানেলটি জানায়, নেতানিয়াহুর নির্দেশিত সামরিক পদক্ষেপ বাস্তবায়নে বাধা দিচ্ছেন জামির।
প্রতিবেদনে জানা গেছে, সেনাপ্রধান জামির নেতানিয়াহুর নির্দেশের আইনি বৈধতা যাচাইয়ের জন্য লিখিত নথিপত্র এবং আরও আলোচনার দাবি জানিয়েছেন। পালমাহিম বিমানঘাঁটিতে আয়োজিত একটি সভায় এই উত্তেজনার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ওই বৈঠকে নেতানিয়াহু ও জামিরের মধ্যকার পরিবেশ ছিল খুবই তিক্ত। একজন জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মন্তব্য করেছেন, জামির এই সময়ে যে ভূমিকা পালন করছেন, তা ভবিষ্যতে গুরুত্বের সঙ্গে স্মরণ করা হবে। তবে সুনির্দিষ্টভাবে কী ধরনের সামরিক পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে, তা প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়নি। এ বিষয়ে আরও আলোচনা এবং অভিযানের আইনি অনুমোদনসংক্রান্ত লিখিত নথিতে নেতানিয়াহুর স্বাক্ষর চেয়েছেন তিনি।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার চ্যানেল ১৩ জানায়, এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে সেনাপ্রধান স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, আসন্ন নির্বাচনের আগে ইরানে কোনো ধরনের সামরিক হামলা চালানোর প্রয়োজনীয়তা তিনি দেখছেন না। জামিরের মতে, যদি কোনো হামলার সিদ্ধান্ত নিতেই হয়, তবে তা কৌশলগত প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতে নেওয়া হবে, নির্বাচনের খাতিরে নয়। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিরক্ষা মহলে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে যে, রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের জন্য ইরান ইস্যুকে ব্যবহার করা হতে পারে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, নেতানিয়াহুর এই সামরিক পরিকল্পনা পুরো অঞ্চলে দ্রুত সংঘাতের বিস্তার ঘটাতে পারে। যদি আমরা সিদ্ধান্ত নিই যে ইরানে হামলা প্রয়োজন, তাহলে তা চালাব।
প্রতিবেদনটি নিয়ে চ্যানেল ১৪-এর সঙ্গে কথা বলার সময় নেতানিয়াহু সব অভিযোগ ‘বাজে কথা’ হিসেবে উড়িয়ে দিয়েছেন। জামিরের সঙ্গে তার কোনো বিরোধ নেই বলেও তিনি দাবি করেন। তবে একই সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু স্বীকার করেছেন যে, তিনি আইডিএফ এবং গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদকে ইরানের বর্তমান সরকার উৎখাতের নির্দেশ দিয়েছেন। যদিও সাম্প্রতিক সামরিক নির্দেশ এবং এই বক্তব্যের মধ্যে সরাসরি কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।
নির্বাচনী প্রচারণার শেষ দিকে এসে ইরানের সঙ্গে নতুন করে উত্তজনা সৃষ্টির চেষ্টা করার পেছনে নেতানিয়াহুর বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিভিন্ন গণমাধ্যম ধারণা করছে। ভোটারদের দৃষ্টি ঘোরানো কিংবা নির্বাচনের তারিখ পেছানোর কৌশল হিসেবে এটি করা হতে পারে বলেও অভিযোগ রয়েছে। যদিও নেতানিয়াহু দৃঢ়তার সঙ্গে এই ধরনের সকল অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছেন। ইসরাইলের বর্তমান পরিস্থিতিতে এই নজিরবিহীন বিরোধ দেশটির অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা। অভিযোগ রয়েছে, নির্বাচনে নিজের সম্ভাবনা বাড়ানো কিংবা ভোট পেছানোর উদ্দেশ্যেও তিনি এমন উদ্যোগ নিতে পারেন। এমন এক সংবেদনশীল ও নাটকীয় মুহূর্তে এটি ঘটতে পারে, যখন ভুল হিসাব-নিকাশের আশঙ্কা রয়েছে।