হরমুজ প্রণালিতে তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনার জেরে ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় শক্তিশালী বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক জলপথে বেসামরিক জাহাজে হামলার জবাব দিতেই এই সামরিক অভিযান শুরু করা হয়েছে।
স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (৭ জুলাই) রাতে দেওয়া এক বিবৃতিতে সেন্টকম জানায়, আন্তর্জাতিক নৌপথে নিরীহ নাবিক ও বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্য করে ইরানের হামলার জন্য ‘ভারী মূল্য’ চাপিয়ে দিতেই এই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। খবর বিবিসির।
ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রের হামলাকে গত মাসে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছেন।
উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সতর্ক করে বলেন, জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা রক্ষায় তেহরান প্রয়োজনীয় ও কঠোর পদক্ষেপ নেবে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, হামলায় কেশম দ্বীপ, বন্দর আব্বাস ও সিরিক এলাকায় বিস্ফোরণ হয়েছে। এতে কয়েকজন আহত হয়েছেন, তবে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি।
সামরিক হামলার আগে মঙ্গলবারই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল রপ্তানির ওপর দেওয়া অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা শিথিলের অনুমতি (ওয়েভার) বাতিল করে।
এই লাইসেন্সের আওতায় ইরান সীমিত পরিসরে তেল ও জ্বালানি পণ্য রপ্তানির সুযোগ পাচ্ছিল, যা গত মাসের যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার অংশ ছিল।
তেহরান এই সিদ্ধান্তকে সমঝোতা ভঙ্গের প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করে বলেছে, এতে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অসৎ উদ্দেশ্য, নীতিগত অসঙ্গতি ও অবিশ্বাসযোগ্যতা’ স্পষ্ট হয়েছে।
কাতার ও সৌদি আরবও হরমুজ প্রণালিতে তাদের দেশের ট্যাংকারে হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করেছে।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি জানান, ‘আল-রেকাইয়াত’ নামের একটি কাতারি জাহাজে হামলার জন্য ইরানকে সম্পূর্ণ দায়ী করা হচ্ছে।
আল-আনসারি বলেন, ইরানকে অবিলম্বে এমন কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে হবে, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহকে হুমকির মুখে ফেলছে।
অন্যদিকে সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ‘ওয়াদিয়ান’ নামের একটি সৌদি তেলবাহী জাহাজও হরমুজ প্রণালিতে হামলার শিকার হয়েছে। রিয়াদের মতে, এটি আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল ও বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই কাতারের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, এটি ‘প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের নীতির পরিপন্থী’।
ইসমাইল বাঘাই দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে সমন্বয় ছাড়া অথবা জাহাজের ট্র্যাকিং তথ্য পরিবর্তন করে চলাচল করলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয় এবং নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হয়।
যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, সোমবার একটি তেলবাহী জাহাজের ইঞ্জিন কক্ষে অজ্ঞাত একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পর আগুন ধরে যায়।
মঙ্গলবার আরও দুটি পৃথক ঘটনায় একটি ট্যাংকার হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার সময় হামলার শিকার হলেও পরবর্তী গন্তব্যে যেতে সক্ষম হয়। অপর একটি জাহাজেও হামলার ফলে সামান্য কাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান কার্যত এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ নিয়ন্ত্রণে নেয়।
সাম্প্রতিক সমঝোতার আওতায় হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে ইরান, ওমান এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
ইরানি সংবাদমাধ্যমের দাবি, নতুন ব্যবস্থার আওতায় ওমানের সঙ্গে সমন্বয় করে হরমুজ প্রণালির নৌ চলাচল তদারকি করবে ইরান এবং জাহাজ চলাচলের জন্য সার্ভিস ফি আরোপের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।