সাংবাদিক সামচ্ছুদ্দিন ইলিয়াসের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল এমন একটি সংবাদমাধ্যম গড়ে তোলা, যা জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশের সংকটে পড়া মানুষের কথা বলবে। প্রায় এক মাস ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন নিয়ে সম্পাদকের টেবিলে ছোটাছুটি করার পর শেষ পর্যন্ত সেটি প্রধান খবর হিসেবে ছাপা হয়। এই সাফল্য ইলিয়াসের আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে দেয়, যদিও মূলধারার সংবাদের ভিড়ে প্রান্তিক মানুষের সংকটের খবরগুলো হারিয়ে যাওয়ার অস্বস্তি থেকেই তিনি নতুন কিছু করার তাগিদ অনুভব করেন। জলবায়ু পরিবর্তন যে শুধু ঘরবাড়ি, জীবিকা আর পরিবেশ কেড়ে নিচ্ছে না, ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি আর পরিচয়ও বদলে দিচ্ছে, তা-ই খুঁজে এনেছিলেন তিনি। ইলিয়াসের বিশ্বাস ছিল, গল্পটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ইলিয়াসের মনে থেকে গেল একটি অস্বস্তি। সাংবাদিকতার দীর্ঘ পথে তিনি বারবার দেখেছেন, পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ খবরকে জায়গা পেতে লড়তে হয় রাজনীতি, সংঘাত আর দিনের আলোচিত শিরোনামের সঙ্গে।
২০২৪ সালের নভেম্বরে যাত্রা শুরু করা ‘দ্য ক্লাইমেট ওয়াচ’ দুই বছর না পেরোতেই বিশ্ব জলবায়ু আলোচনার মঞ্চে নিজেদের অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে। আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর তুরস্কের আন্তালিয়ায় অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলনে (কপ৩১) প্রতিষ্ঠানটি আটজন সাংবাদিকের একটি বিশেষ দল পাঠাচ্ছে। ইলিয়াসের ভাষায়, “কণ্ঠহীন মানুষের কণ্ঠ হতেই আমি সাংবাদিকতায় এসেছি। সাংবাদিকতা সেই প্রান্তিক মানুষদের প্রতিনিধিত্ব করবে, যাঁদের কষ্ট প্রায়ই শিরোনামের বাইরে থেকে যায়।” উপকূলীয় অঞ্চলের প্রতিটি প্রান্তে ঘুরে মানুষের দুর্দশা ও অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি এই উদ্যোগ নিয়েছেন। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক যে নামগুলোর ভেতর দিয়ে প্রকাশ পেত, সেই নামগুলোও হারিয়ে যাচ্ছে। দিনের পর দিন আলোচনার পর অবশেষে সম্মতি মিলল।
একটি স্বাধীন পরিবেশবিষয়ক অনলাইন সংবাদমাধ্যম হিসেবে এর যাত্রা ছিল চ্যালেঞ্জিং। ঢাকা থেকে ফেরার পথে সহকর্মী মোস্তফা ইউসুফের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমেই ‘দ্য ক্লাইমেট ওয়াচ’ নামের উৎপত্তি। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সালেহ নোমানসহ অন্যান্য জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সহায়তায় তথ্য অধিদপ্তরের (পিআইডি) নিবন্ধন পায় প্রতিষ্ঠানটি। সালেহ নোমানের মতে, ইলিয়াসের এই দূরদর্শী ভাবনা ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে গেছে।
সংবাদমাধ্যমটি এমন সব বিষয়ে আলোকপাত করছে যা সাধারণত মূলধারার সংবাদমাধ্যমে কম গুরুত্ব পায়। যেমন, মিরসরাইয়ের জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল নিয়ে অনুসন্ধান, যেখানে উপকূলীয় বন উজাড় ও বন্যপ্রাণীর আবাস ধ্বংসের তথ্য উঠে এসেছে। এছাড়া ১৭ কোটি ৫০ লাখ ডলারের বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত ‘সুফল’ প্রকল্পের অনিয়ম নিয়েও তারা শক্তিশালী প্রতিবেদন করেছে, যা পরে দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তেও সহায়ক হয়েছে।
২০২৬ সালে প্রতিষ্ঠানটি তাদের কাজের জন্য বড় স্বীকৃতি লাভ করে। এশিয়ার ১১ দেশের ১৪টি বার্তাকক্ষের যৌথ উদ্যোগ “ডার্ক সাইড অব দ্য বুম” প্রতিবেদনের জন্য তারা ‘কাভারিং ক্লাইমেট নাউ জার্নালিজম অ্যাওয়ার্ড’ এবং ‘সোসাইটি অব পাবলিশার্স ইন এশিয়া’ (সোপা)-এর পরিবেশ বিষয়ক শ্রেষ্ঠত্বের পুরস্কার অর্জন করে। এছাড়া সাংবাদিকতায় উদ্ভাবনের জন্য ‘অসবর্ন এলিয়ট প্রাইজ’-এর বিশেষ স্বীকৃতিও তাদের ঝুলিতে রয়েছে। প্রতিবেদনের বিষয় ছিল হারিয়ে যেতে বসা নামকরণের ঐতিহ্য।
তাদের কাজের আরেকটি বিশেষ দিক হলো পাখির প্রজাতি ও তাদের আবাসস্থল রক্ষার উদ্যোগ “বার্ডস ইন ক্লাইমেট ক্রাইসিস”। এই উদ্যোগের আওতায় ১০০টি স্বল্পদৈর্ঘ্যের প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের কাজ চলছে। এছাড়া দুবাইয়ে কপ২৮, বাকুতে কপ২৯ এবং ব্রাজিলের বেলেমে কপ৩০ সম্মেলনে অংশগ্রহণের পর এবার আন্তালিয়ায় তারা জলবায়ু অর্থায়ন ও আঞ্চলিক ইস্যুগুলো তুলে ধরার লক্ষ্য স্থির করেছে। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী সম্পাদক মো. ইব্রাহিম খলিলুল্লাহর মতে, তাদের লক্ষ্য কেবল আলোচনা তুলে ধরা নয়, বরং আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার মেলবন্ধন ঘটানো।