দীর্ঘ সময় ধরে গ্যাস না পেয়ে চট্টগ্রামের ষোলশহর এলাকায় সড়ক অবরোধ করেছেন সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকেরা। ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও গ্যাস না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ চালকরা গতকাল শুক্রবার সকালে এই কর্মসূচি পালন করেন। পরে পুলিশের অনুরোধে তারা রাস্তা থেকে সরে যান। মোহাম্মদ হানিফ নামের এক চালক জানান, ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও গ্যাসের দেখা মেলেনি, যার ফলে পরিবার নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তারা। ফসিল ফিলিং স্টেশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরবরাহ না থাকায় তাদের কিছুই করার নেই।
এদিকে, তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে সৃষ্ট জন-অসন্তোষ ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে জামালপুর ও জয়পুরহাট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি জেলা প্রশাসনের কাছে নিরাপত্তা চেয়ে চিঠি দিয়েছে। জামালপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, এলাকায় দৈনিক চাহিদা ১৭০ মেগাওয়াট হলেও জাতীয় গ্রিড থেকে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ। ফলে গ্রাহকদের প্রতিদিন ১৪ থেকে ১৫ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের শিকার হতে হচ্ছে। ইসলামপুর উপজেলার গ্রাহক মিজানুর রহমান জানান, দিনে মাত্র চার-পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে, তাও আবার ৩০ মিনিট পরপর আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকে।
জয়পুরহাট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পরিস্থিতি আরও নাজুক। সেখানে দৈনিক ৭২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ২৬ থেকে ২৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। সমিতির মহাব্যবস্থাপক মাহবুবুল হক জানান, চাহিদার অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ পাওয়ায় দীর্ঘ সময় লোডশেডিং দিতে হচ্ছে, যা জনমনে ক্ষোভ তৈরি করেছে। পাঁচবিবি উপজেলায় সমিতির এক মিটার রিডারকে মারধরের ঘটনার পর মাঠপর্যায়ের কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে জেলার পাঁচটি উপজেলার ১০টি উপকেন্দ্রের নিরাপত্তা জোরদারে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে।
এর আগে গোপালগঞ্জ, নীলফামারী ও কুষ্টিয়ার স্থানীয় কার্যালয়সহ সারা দেশের বিদ্যুৎ স্থাপনা ও কর্মীদের নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে চিঠি দিয়েছিল বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশন। ওজোপাডিকো ও নেসকোর স্থানীয় কার্যালয় থেকেও একই ধরনের নিরাপত্তা চাওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনেও দেখা দিয়েছে বড় ধরনের সংকট। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে শুক্রবার সকাল থেকে দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের এক নম্বর ইউনিটের উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এই ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে ৫০ থেকে ৫৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ হতো, যা বন্ধ হওয়ায় উত্তরাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের মাত্রা আরও বেড়েছে।
গত তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা গ্যাস সংকটে শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে সামিটের এলএনজি টার্মিনাল থেকে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংকট আরও ঘনীভূত হয়। যদিও বঙ্গোপসাগরে এলএনজি নিয়ে নতুন একটি জাহাজ পৌঁছানোয় আজ শনিবার সকাল থেকে পাইপলাইনে সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে, কারিগরি ত্রুটির কারণে শুক্রবার বিকেল চারটায় এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালটিও বন্ধ হয়ে যায়, যা রাত আটটা পর্যন্ত সচল করা সম্ভব হয়নি। কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত এই দুটি টার্মিনালের মধ্যে এক্সিলারেটের সক্ষমতা ৬০ কোটি ঘনফুট এবং সামিটের ৫০ কোটি ঘনফুট। গত ২১ জুলাই এক্সিলারেটের টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর থেকেই দেশে গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে।
এতে উত্তরাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি বেড়ে লোডশেডিং আরও বেড়ে গেছে।
আজ শনিবার সকালের মধ্যে পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ বাড়তে শুরু করবে।
এতে সেই সময়ে গ্যাসের সংকট আরও তীব্র হয়েছিল।
এভাবে দিনের পর দিন বসে থাকলে পরিবার নিয়ে কীভাবে চলব?’
চিঠিতে বলা হয়েছে, সমিতির আওতাধীন এলাকায় বিদ্যুতের গড় চাহিদা ১৭০ মেগাওয়াট।
প্রতিদিন প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, লোডশেডিং নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে গ্রাহকেরা বিরূপ প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন।
পরিস্থিতি যেকোনো সময় আরও অবনতি হয়ে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে।
তাই সমিতির অফিস, উপকেন্দ্র ও কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে চিঠিতে।
জেলায় বিদ্যুতের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৭২ মেগাওয়াট।
এ অবস্থায় মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিয়ে তৈরি হয়েছে বাড়তি উদ্বেগ।
[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ও চট্টগ্রাম; প্রতিনিধি, জামালপুর ও জয়পুরহাট এবং প্রতিনিধি, সৈয়দপুর, নীলফামারী]