মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬, ১১:৪৭ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
পুলিশ অভিযানের ধারাবাহিকতায় রায়গঞ্জে ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি গ্রেপ্তার বিয়ে ছাড়াই সুখী এই বলিউড সুন্দরীরা টোল আদায়ে অনিয়ম: শেখ হাসিনাসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন ২০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে আওয়ামী লীগের ২৬ নেতাকর্মী গ্রেপ্তার নাটোরে জুট মিলে ডাকাতি: লুণ্ঠিত মালামালসহ আন্তঃজেলা ডাকাত দলের ৬ সদস্য গ্রেফতার উলিপুরে বাইপাস সড়ক দ্রুত শুরুর দাবিতে মানববন্ধন নাটোরে তিন দিনব্যাপীঃ ২৫ জাতের আম ও ৩৭ প্রজাতির দেশীয় ফলের সমাহার, ফল মেলা প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে পাঠানোর নামে কোটি টাকার পণ্য সহ রাজস্ব কর্মকর্তাসহ আটক-৩ চাঁদপুর জেলায় ৩লাখ ৬৬ হাজার শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ খাওয়ানো হবে বিশিষ্ট আলেম হাফিজ মাওলানা আলহাজ্ব জামাল উদ্দিন আর নেই

পদ্মার বালুচরে চিনাবাদামের সবুজ বিপ্লব, সোনালি স্বপ্নে বিভোর লালপুরের কৃষক

নাটোর প্রতিনিধি ঃ

একসময় যে বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল ছিল পদ্মা নদীর খেয়ালি স্রোতের দখলে, বছরের পর বছর পড়ে থাকত অনাবাদি ও অবহেলিত, সেই বালুচরই এখন হয়ে উঠেছে কৃষকদের আশার আলো। নাটোরের লালপুর উপজেলার পদ্মা নদীর জেগে ওঠা বিস্তীর্ণ চরজুড়ে এখন চোখে পড়ে শুধু সবুজের সমারোহ। সেই সবুজের আড়ালে লুকিয়ে আছে হাজারো কৃষকের স্বপ্ন, পরিশ্রম ও সাফল্যের গল্প। চরাঞ্চলের বালুময় মাটিতে ব্যাপক হারে চিনাবাদামের চাষ করে কৃষকরা দেখছেন অর্থনৈতিক মুক্তির নতুন সম্ভাবনা।

বর্তমানে লালপুরের তিলোকপুর, নিমতলী, গৌরীপুর, চর জাজিরা, মোহরকয়া, বিলমাড়ীয়া, নওশারা ও আশপাশের বিভিন্ন চর এলাকায় চিনাবাদামের বাম্পার ফলন হয়েছে। মৌসুমের এ সময়ে কৃষকরা বাদাম উত্তোলন, শুকানো ও বাজারজাতকরণে ব্যস্ত সময় পার করছেন। কোথাও শ্রমিকরা মাঠ থেকে বাদাম তুলছেন, আবার কোথাও পরিবারের সদস্যরা উঠানে বসে গাছ থেকে বাদাম আলাদা করছেন। পুরো চরাঞ্চলজুড়ে এখন যেন উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে।

স্থানীয় কৃষকদের মতে, পদ্মার চরের বালুময় মাটি চিনাবাদাম চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। তুলনামূলক কম খরচে অধিক ফলন হওয়ায় এবং বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে দিন দিন এই ফসলের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। অন্যান্য ফসলের তুলনায় চিনাবাদামে সেচ, সার ও কীটনাশকের ব্যবহার কম হওয়ায় উৎপাদন ব্যয়ও কম। ফলে লাভের পরিমাণ বেশি হওয়ায় চরাঞ্চলের কৃষকরা এখন ব্যাপকভাবে এ ফসলের দিকে ঝুঁকছেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কয়েক মাস আগেও যেখানে ছিল ধু-ধু বালুর চর, সেখানে এখন শত শত একর জমিজুড়ে চিনাবাদামের আবাদ হয়েছে। বাতাসে দুলছে সবুজ গাছ, আর মাটির নিচে লুকিয়ে আছে কৃষকের সোনালি ফসল। চরাঞ্চলের মানুষের কাছে চিনাবাদাম এখন শুধু একটি ফসল নয়, বরং জীবিকা ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নের অন্যতম ভরসা।

ঈশ্বরদী ইউনিয়নের কৃষক রবি হোসেন জানান, তিনি চলতি মৌসুমে পাঁচ বিঘা জমিতে চিনাবাদামের আবাদ করেছেন। জমি প্রস্তুত, বীজ, শ্রমিক ও অন্যান্য খাতে তার প্রায় ৮০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে।

তিনি বলেন, “আগে এই চরজমি অনেকটাই অনাবাদি থাকত। এখন কৃষি বিভাগের পরামর্শে চিনাবাদাম চাষ করছি। ফলন খুব ভালো হয়েছে। বাজারদর ঠিক থাকলে প্রায় এক লাখ ৩০ হাজার টাকার বাদাম বিক্রি করতে পারব। সব খরচ বাদ দিয়েও ভালো লাভ হবে। আগামী বছর আরও বেশি জমিতে চাষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

একই এলাকার কৃষক আব্বাস উদ্দিন বলেন, “চিনাবাদাম চাষে ঝুঁকি কম এবং লাভ বেশি। এ ফসলে সেচের প্রয়োজন হয় না বললেই চলে। সার ও কীটনাশকও কম লাগে। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো পাইকাররা সরাসরি মাঠে এসে বাদাম কিনে নিয়ে যায়। এতে পরিবহন খরচ ও ঝামেলা দুটোই কমে যায়। আমি প্রতি বিঘায় ১৩ থেকে ১৪ মণ পর্যন্ত ফলন পেয়েছি।

চর জাজিরা এলাকার কৃষক সাইফুল ইসলাম বলেন, “পদ্মার চর আমাদের জীবনের সঙ্গে মিশে আছে। আগে বন্যার পর জমি পড়ে থাকত। এখন চিনাবাদাম চাষ করে সংসারের খরচ চালানোর পাশাপাশি সন্তানদের লেখাপড়ার ব্যয়ও বহন করতে পারছি। এ ফসল আমাদের নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, লালপুর উপজেলার ঈশ্বরদী, সদর ও বিলমাড়ীয়া ইউনিয়নসহ পাঁচটি কৃষি ব্লকের প্রায় ৩ হাজার ৭৫৪ হেক্টর চরাঞ্চলের মধ্যে চলতি মৌসুমে ৪৬৫ হেক্টর জমিতে চিনাবাদামের আবাদ হয়েছে। আবাদকৃত জমিতে বারি চিনাবাদাম-৮, বারি চিনাবাদাম-৯, ঢাকা চিনাবাদাম-১ ও বিনা চিনাবাদাম-৮ জাতের বাদাম চাষ করা হয়েছে। প্রতি হেক্টরে গড়ে প্রায় ২ দশমিক ১ মেট্রিক টন ফলন পাওয়া গেছে, যা কৃষকদের প্রত্যাশার চেয়েও বেশি।

কৃষি বিভাগ বলছে, চরাঞ্চলের অনাবাদি জমিকে উৎপাদনের আওতায় আনতে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। উন্নত জাতের বীজ সরবরাহ, কৃষকদের প্রশিক্ষণ, মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত পরামর্শ এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে চিনাবাদাম চাষে এ সাফল্য এসেছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রীতম কুমার হোড় বলেন, “আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। উন্নত জাতের বীজ, প্রযুক্তিগত পরামর্শ ও মাঠ পর্যায়ের তদারকির কারণে এ বছর চিনাবাদামের ফলন অত্যন্ত ভালো হয়েছে। কৃষকদের আগ্রহও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আগামী মৌসুমে আবাদি জমির পরিমাণ আরও বাড়বে বলে আশা করছি।

তিনি আরও বলেন, “চরাঞ্চলের মাটির বৈশিষ্ট্য চিনাবাদাম চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। সঠিক পরিচর্যা ও আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে কৃষকরা আরও বেশি উৎপাদন করতে পারবেন।

নাটোর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. হাবিবুর রহমান খান বলেন, “পদ্মার চরাঞ্চল বর্তমানে কৃষির নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে উঠেছে। বিশেষ করে চিনাবাদাম একটি উচ্চমূল্যের অর্থকরী ফসল হওয়ায় কৃষকরা ভালো লাভবান হচ্ছেন। কৃষি বিভাগ কৃষকদের সব ধরনের কারিগরি সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। অনাবাদি ও পতিত চরজমিকে উৎপাদনের আওতায় এনে শুধু কৃষকের আয় বৃদ্ধি নয়, দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

তিনি আরও বলেন, “চিনাবাদামে রয়েছে উচ্চমাত্রার প্রোটিন ও তেলজাতীয় উপাদান, যা দেশের খাদ্যশিল্প ও ভোজ্যতেল উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই ভবিষ্যতে চরাঞ্চলে চিনাবাদামের আবাদ আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। আমরা চাই লালপুরের পদ্মা চর একসময় দেশের অন্যতম বৃহৎ চিনাবাদাম উৎপাদন অঞ্চল হিসেবে পরিচিতি লাভ করুক।

স্থানীয় কৃষি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পদ্মার চরে চিনাবাদাম চাষের এই সাফল্য শুধু কৃষকদের জীবনমান উন্নয়নেই ভূমিকা রাখছে না, বরং স্থানীয় অর্থনীতিতেও নতুন গতি সঞ্চার করছে। মৌসুমভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষিপণ্যের বাজার সম্প্রসারণ এবং চরাঞ্চলের মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নে চিনাবাদাম চাষ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

একসময় নদীভাঙন, বন্যা আর অনিশ্চয়তার প্রতীক ছিল পদ্মার চর। আজ সেই চরই হয়ে উঠেছে সম্ভাবনার মাঠ। কৃষকের ঘামে ভেজা সেই বালুচরে জন্ম নিচ্ছে নতুন স্বপ্ন, নতুন আশা। পদ্মার বুকে জেগে ওঠা বালুচর যেন এখন সোনার ফসলের রাজ্য—যেখানে চিনাবাদামের প্রতিটি গাছ কৃষকের মুখে ফুটিয়ে তুলছে সাফল্যের হাসি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


আমাদের ফেসবুক পেইজ