রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬, ০১:১৫ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
দক্ষিণ গফরগাঁও উপজেলার ” বেগম রাবেয়া মেমোরিয়াল হাই স্কুল” কে জাতীয়করণের দাবী এলাকাবাসীর যমুনার নদীতে গোসল করতে নেমে ২ মাদরাসা শিক্ষার্থীর মৃত্যু রায়গঞ্জে ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে নিহত ১: গ্রেফতার দুই দুর্নীতি আড়াল করতে গফরগাঁওয়ের রাবেয়া স্কুলের সহকারী শিক্ষকদের সাদা কাগজে সাক্ষর দিতে বলেন দুর্নীতিবাজ আফাজ উদ্দিন ও সাখাওয়াত হোসেন “সতর বাড়ী গ্রামে দক্ষিণ গফরগাঁও উপজেলার বিভিন্ন সরকারী প্রতিষ্ঠান স্থাপন করার জন্য গফরগাঁও এর মাননীয় সংসদ সদস্যের নিকট এলাকাবাসীর দাবী “ চাঁদপুরের মেঘনার ঘূর্ণিস্রোতে কার্গোডুবিতে ৫ হাজার বস্তা ধান-চাল পানিতে ভবিষ্যতে জনগণ আর রাজনীতিবিদদের সম্মান করবে না: জামায়াত আমির প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন ঢাকা মেডিকেল পরিদর্শনে উচ্ছ্বসিত সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফেরত আনতে পঞ্চদশ সংশোধনীর আপিলের রায় কাল ট্রাফিক বিভাগে কর্মরত অফিসার্স ও ফোর্সদের প্রশংসনীয় পুরস্কার সম্মাননা প্রদান

বিশিষ্ট আলেম হাফিজ মাওলানা আলহাজ্ব জামাল উদ্দিন আর নেই

ছাতক প্রতিনিধি (সুনামগঞ্জ)ঃ

সিলেটের কোরআন শিক্ষার জগতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন ঘটেছে। হাজারো হাফিজে কোরআন তৈরির কারিগর, বিশিষ্ট আলেম, শিক্ষাবিদ ও সমাজসংস্কারক হাফিজ মাওলানা আলহাজ্ব জামাল উদ্দিন ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তাঁর মৃত্যুতে সিলেটসহ সারাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মাঝে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। কোরআনের শিক্ষা বিস্তার, দ্বীনি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং অসহায়-এতিম শিশুদের শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি যে অবদান রেখে গেছেন, তা দীর্ঘদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে।

সোমবার (২২ জুন) সকাল সাড়ে ১১টায় সিলেটের ইবনে সিনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭০ বছর। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা তাঁর ছাত্র, শুভানুধ্যায়ী ও ভক্তদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য মানুষ তাঁর স্মৃতিচারণ করে শোক প্রকাশ করেন এবং তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনা করেন।

হাফিজ মাওলানা জামাল উদ্দিন ১৯৫৬ সালের ২০ জানুয়ারি সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার শ্রীরামপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত ধর্মীয় পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন সিলেটের খ্যাতিমান হাফিজ মরহুম রফিকুল ইসলাম এবং মাতা আশরাফুন নেছা। ছোটবেলা থেকেই তিনি ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি গভীর অনুরাগী ছিলেন। পিতা-মাতার তত্ত্বাবধানে প্রাথমিক শিক্ষা অর্জনের পর অল্প বয়সেই তিনি পবিত্র কোরআন মুখস্থ করার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। মাত্র ১৪ বছর বয়সে তিনি হিফজুল কোরআন সম্পন্ন করে এলাকার মানুষের প্রশংসা অর্জন করেন।

শৈশব থেকেই কোরআনের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা এবং শিক্ষার প্রতি নিষ্ঠা পরবর্তী সময়ে তাঁকে একজন সফল শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠান গড়ার কারিগর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। ১৯৭১ সালে মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত আনোয়ারুল উলুম আলিম মাদ্রাসায় শিক্ষকতার মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবনের সূচনা হয়। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি কোরআনের আলো সাধারণ মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্ন লালন করতেন।

এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পরবর্তীতে শ্রীমঙ্গলের নতুনবাজার এলাকায় একজন শিক্ষানুরাগী ব্যক্তির সহযোগিতায় তিনি প্রতিষ্ঠা করেন দারুল কোরআন হাফিজিয়া মাদ্রাসা। শুরুতে প্রতিষ্ঠানটির অবকাঠামো ছিল অত্যন্ত সীমিত। কিন্তু তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম, দূরদর্শী নেতৃত্ব, আন্তরিকতা এবং আল্লাহর ওপর অগাধ বিশ্বাসের ফলে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানটি একটি বৃহৎ ও সুপরিচিত দ্বীনি শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হয়।

দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে তিনি শুধু একটি মাদ্রাসাই গড়ে তোলেননি, বরং প্রতিষ্ঠা করেন পাঁচতলা বিশিষ্ট মসজিদ, আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন হাফিজিয়া মাদ্রাসা এবং এতিমখানা। তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিবছর অসংখ্য শিক্ষার্থী কোরআনের হাফিজ হয়ে বেরিয়ে আসে এবং দেশ-বিদেশে ইসলামি শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেয়।

জানা যায়, তাঁর হাতে শিক্ষালাভ করা হাজারো হাফিজ বর্তমানে বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় ২৫টি দেশে কোরআনের খেদমতে নিয়োজিত রয়েছেন। কেউ ইমাম, কেউ শিক্ষক, কেউ খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর ছাত্ররা আজ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ইসলামের সৌন্দর্য ও কোরআনের শিক্ষা প্রচারে ভূমিকা রাখছেন। ফলে তাঁর অবদান শুধু একটি অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং আন্তর্জাতিক পরিসরেও বিস্তৃত।

হাফিজ মাওলানা জামাল উদ্দিনের জীবনের সবচেয়ে অনন্য দিক ছিল তাঁর আত্মত্যাগ ও নিঃস্বার্থ সেবা। জীবনের প্রায় ৬০ বছর তিনি বিনা বেতনে ইমাম, খতিব ও শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ব্যক্তিগত আর্থিক লাভের চেয়ে তিনি সবসময় আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং কোরআনের খেদমতকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তাঁর কাছে দ্বীনি শিক্ষা ছিল ইবাদতেরই একটি অংশ। তিনি বিশ্বাস করতেন, একজন শিক্ষার্থীকে কোরআনের আলোয় আলোকিত করতে পারাই একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় সফলতা।

সমাজের অসহায়, দরিদ্র ও এতিম শিশুদের প্রতি ছিল তাঁর বিশেষ মমত্ববোধ। তিনি বহু শিশুর লেখাপড়া, থাকা-খাওয়া এবং নৈতিক শিক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। অনেক এতিম ও সুবিধাবঞ্চিত শিশু তাঁর প্রতিষ্ঠানে আশ্রয় পেয়ে শিক্ষিত হয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মানবিকতা, সততা, নৈতিকতা এবং ইসলামী আদর্শে শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন এক অনন্য ব্যক্তিত্ব।

ব্যক্তিজীবনেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাদাসিধে, বিনয়ী এবং পরোপকারী। মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে দাঁড়ানো ছিল তাঁর স্বভাব। ১৯৭৬ সালের ডিসেম্বরে তিনি বিশ্বনাথের সৈয়দবাড়ির সৈয়দ আখতার হোসেন মাস্টারের বড় মেয়ের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। মৃত্যুকালে তিনি দুই ছেলে, দুই মেয়ে, নাতি-নাতনি, অসংখ্য ছাত্র-শিষ্য এবং গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

তাঁর মৃত্যুতে শোক জানিয়ে বিভিন্ন সামাজিক, ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নেতৃবৃন্দ গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তারা বলেন, হাফিজ মাওলানা জামাল উদ্দিন ছিলেন কোরআনের একজন নিবেদিতপ্রাণ খাদেম। তাঁর মতো নিষ্ঠাবান, সৎ ও কর্মমুখী আলেম সমাজে বিরল। তাঁর ইন্তেকালে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।

মরহুমের জানাজার নামাজ শ্রীমঙ্গল নতুনবাজার মসজিদে পাঁচ দফায় অনুষ্ঠিত হয়। পরে রাত ১০টায় তাঁর নিজ গ্রাম শ্রীরামপুর হাফিজিয়া মাদ্রাসা মাঠে শেষ জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। শিক্ষক সৈয়দ আশিক হোসেনের পরিচালনায় জানাজায় ইমামতি করেন হাফিজ মাওলানা আব্দুল হান্নান। জানাজায় হাজারো মুসল্লি অংশগ্রহণ করেন। পরে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর পিতা মরহুম হাফিজ রফিকুল ইসলামের কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়।

হাফিজ মাওলানা আলহাজ্ব জামাল উদ্দিনের কর্মময় জীবন, কোরআনের প্রতি অগাধ ভালোবাসা, শিক্ষার প্রসারে তাঁর অবদান এবং মানবসেবার দৃষ্টান্ত আগামী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে। একজন আলেম, শিক্ষক ও সমাজসেবক হিসেবে তিনি মানুষের হৃদয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তাঁর রেখে যাওয়া প্রতিষ্ঠান, ছাত্র-শিষ্য এবং সেবামূলক কর্মকাণ্ডই ভবিষ্যতে তাঁর জীবন্ত স্মারক হয়ে থাকবে।

আল্লাহ তাআলা মরহুমকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবার, ছাত্র-শিষ্য ও শুভানুধ্যায়ীদের ধৈর্য ধারণের তাওফিক দান করুন। আমিন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


আমাদের ফেসবুক পেইজ