ভুল পরিচয়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে কারাভোগ করা সোনা মিয়া অবশেষে মুক্তি পেয়েছেন। শুক্রবার (১৫ আগস্ট) সকাল ১১টার দিকে কক্সবাজার জেলা কারাগার থেকে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তিনি মুক্তি লাভ করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কক্সবাজার জেলা কারাগারের জেলার মো. দেলোয়ার জাহান।
এর আগে বৃহস্পতিবার কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ মো. আব্দুর রহিমের আদালত চারটি শর্তে সোনা মিয়াকে কারামুক্তির আদেশ প্রদান করেন। আদালতের সেই আদেশ পাওয়ার পর শুক্রবার সকালে কারা কর্তৃপক্ষ তাকে মুক্তি দেয়। কারাগার থেকে বের হওয়ার পর স্ত্রী, সন্তান ও মাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। স্বজনেরা তাকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেন।
কারামুক্তির পর সোনা মিয়া নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, কারাগারের প্রতিটি মুহূর্ত তার কাছে দিনের মতো এবং প্রতিটি দিন বছরের মতো দীর্ঘ মনে হয়েছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে শুরুতেই যদি সুষ্ঠু তদন্ত করা হতো, তবে তাকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতো না। তিনি তাকে কারামুক্তিতে সহযোগিতাকারীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
জেলার মো. দেলোয়ার জাহান জানান, সোনা মিয়া কারাগারে আসার পর রোলকলে জানতে চেয়েছিলেন তাকে কী অপরাধে আনা হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে গ্রেপ্তারের কথা শুনে তিনি বিস্মিত হয়েছিলেন। পরে পুরোনো নথিতে থাকা ছবি, পরিচয় ও অন্যান্য তথ্যের সঙ্গে তার তথ্য যাচাই করে গরমিল পাওয়া যায়। বিষয়টি আদালতকে জানানো হলে তদন্ত শুরু হয় এবং পরিচয় নিয়ে জটিলতার বিষয়টি সামনে আসে।
আদালতের শর্ত অনুযায়ী, সোনা মিয়াকে তার জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও পাসপোর্ট জমা দিতে হবে। তিনি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিদেশ যেতে পারবেন না। এছাড়া প্রতি মাসের প্রথম মঙ্গলবার কক্সবাজার সদর থানায় হাজির হয়ে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি প্রতি তিন মাস পর সোনা মিয়ার উপস্থিতি ও অবস্থান সম্পর্কে আদালতে প্রতিবেদন দিতে সদর থানাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২০ সালের ১ মার্চ, যখন রামু ও কক্সবাজার সদর এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ পাঁচজনকে আটক করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। মামলার এজাহারে এক ব্যক্তির পকেটে পাওয়া জন্মনিবন্ধন সনদের তথ্যের ভিত্তিতে সোনা মিয়ার নাম দুই নম্বর আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ২০২২ সালের ১৩ জুন মাদক মামলায় কারাবন্দি থাকা প্রকৃত সোনা মিয়া পরিচয়ধারী রমজান আলী জামিন নিয়ে আত্মগোপনে চলে যান।
দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদালত সোনা মিয়াসহ পাঁচ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন। রায় ঘোষণার পর গত ২৩ জুন গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ভিত্তিতে র্যাব-১৫-এর একটি দল চকরিয়ার ডুলাহাজারায় অভিযান চালিয়ে প্রকৃত সোনা মিয়াকে গ্রেপ্তার করে। আদালতে হাজির করা হলে তাকে কক্সবাজার জেলা কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
কারাগারে যাওয়ার দুই থেকে তিন দিন পর সোনা মিয়া জেল সুপারের কাছে আবেদন করে জানান যে তিনি ওই মামলার আসামি নন। এরপর মামলায় মৃত্যুদণ্ড পাওয়া সোনা মিয়ার ছবি, আঙুলের ছাপ ও ঠিকানার সঙ্গে কারাগারে থাকা সোনা মিয়ার তথ্যের যাচাই করা হয়। জেল সুপার বিষয়টি লিখিতভাবে জেলা ও দায়রা জজকে জানান। আদালত ঘটনা যাচাইয়ের জন্য কক্সবাজার সদর মডেল থানাকে নির্দেশ দেন এবং পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন ও অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে তাকে কারামুক্তির আদেশ দেন।
পরদিন ডিবি পুলিশের পরিদর্শক মিজানুর রহমান বাদী হয়ে একটি মামলা করেন।