রবিবার, ২১ জুন ২০২৬, ০৪:২৯ অপরাহ্ন

সুইজারল্যান্ডে শুরু হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা, ইরানের হরমুজ বন্ধের দাবী

নিউজ ডেস্ক ঃ

ইসরায়েলের দক্ষিণ লেবাননে হামলার জেরে হরমুজ প্রণালী আবারও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছে ইরান। এ পরিস্থিতির মধ্যেই সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি আলোচনা শুরু হতে যাচ্ছে।

সংবাদমাধ্যম বিবিসি এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে। তবে ইরানের এ দাবির বিরোধিতা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। তাদের দাবি, হরমুজ প্রণালী দিয়ে এখনো স্বাভাবিকভাবে জাহাজ চলাচল অব্যাহত রয়েছে।

ইরান জানিয়েছে, লেবাননে ইসরায়েলের প্রাণঘাতী হামলা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ অবসানের যে সমঝোতা হয়েছিল, তার লঙ্ঘন। এর প্রতিক্রিয়ায় হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

শনিবার (২০ জুন) রাতে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সুইজারল্যান্ডের উদ্দেশে ওয়াশিংটন ত্যাগ করেন।

অন্যদিকে, ইরানের প্রতিনিধি দল যার মধ্যে পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি রয়েছেন ইতোমধ্যে সেখানে পৌঁছেছেন।

রোববার (২১ জুন) নতুন দফার এই আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। ভ্যান্স বলেছেন, তিনি পারমাণবিক ইস্যু এবং লেবানন যুদ্ধবিরতি বিষয়ে অগ্রগতি আশা করছেন। সুইজারল্যান্ড যাওয়ার আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে উত্তেজনা কিছুটা কমেছে এবং পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে।

তিনি বলেন, ইসরায়েল ও লেবাননের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিস্থিতি ধারাবাহিকভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। আমাদের মূল লক্ষ্য পুরো অঞ্চলকে নিরাপদ ও স্থিতিশীল করা। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, আলোচনায় তাদের প্রধান দাবি হবে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্য পক্ষগুলো যেন নিজেদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করে।

এদিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ আলোচনার উদ্বোধনী অধিবেশনে অংশ নেবেন বলে জানিয়েছে তার কার্যালয়। পুরো যুদ্ধকালীন সময়ে পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে এবং এর আগে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার একটি পর্বও আয়োজন করেছিল।

চলতি সপ্তাহের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রেসিডেন্টরা যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি প্রাথমিক চুক্তিতে সই করেন। এতে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতির পাশাপাশি আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে নতুন আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করা হয়। তবে পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছে লেবাননে ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর চলমান সংঘর্ষ।

লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত ৪৭ জন নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) দাবি করেছে, তারা হিজবুল্লাহ-সংশ্লিষ্ট ৮০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে এবং সংগঠনটির ‘ডজনখানেক’ সদস্যকে হত্যা করেছে। একই সঙ্গে তাদের চার সেনাও নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে আইডিএফ।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি ঘোষণার পরও ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে গোলাগুলি চলতে থাকে। তবে শুক্রবার বিকেলে উভয় পক্ষের মধ্যে তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।

চুক্তির আগে ইসরায়েল জানিয়েছিল, তারা লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহারের কোনো পরিকল্পনা করছে না এবং হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে তাদের অভিযান ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের অংশ নয়। অন্যদিকে হিজবুল্লাহ বলেছে, লেবাননে ইসরায়েলের হামলা বৃহত্তর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা নস্যাৎ করার চেষ্টা। যুক্তরাষ্ট্রও লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়ে সমালোচনা করেছে। হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে রকেট হামলা চালানোর পর লেবানন সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হন বলে দাবি করা হয়।

লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২ মার্চ থেকে পুনরায় শুরু হওয়া সংঘাতে এখন পর্যন্ত ৪ হাজার ৫৭ জন নিহত হয়েছেন। এদিকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, লেবাননে ইসরায়েলের হামলা যুদ্ধবিরতির অঙ্গীকার লঙ্ঘন করেছে। এ কারণে যুদ্ধ সমাপ্তির চুক্তির পর পুনরায় চালু হওয়া হরমুজ প্রণালী আবার বন্ধ করা হয়েছে।

ইরানের সামরিক বাহিনী আরও অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র দুই দেশের ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকের প্রথম ধারা বাস্তবায়ন করেনি। ওই ধারায় লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান তাৎক্ষণিক ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করার কথা বলা হয়েছিল। তবে ইরানের এ ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)-এর মুখপাত্র টিম হকিন্স বলেন, হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল অব্যাহত রয়েছে। তিনি জানান, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং ইরানের প্রণালীটির ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। সেন্টকম জানিয়েছে, শনিবার হরমুজ প্রণালী দিয়ে ৫৫টি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করেছে, যেগুলোতে বিশ্ববাজারের জন্য ১ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল পরিবহন করা হয়েছে।

বিবিসি ভেরিফাইয়ের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শনিবার অন্তত পাঁচটি তেলবাহী ট্যাংকার প্রণালী অতিক্রম করেছে। তবে কয়েকটি জাহাজকে ওই এলাকায় দিক পরিবর্তন করতেও দেখা গেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ করেছিল, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা সৃষ্টি করে।

বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকার চলাচলের উপযোগী এই জলপথটি মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানিকারক দেশগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল ও তেলজাত পণ্য হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়েছে। বছরে এর আর্থিক মূল্য প্রায় ৬০০ বিলিয়ন ডলার।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


আমাদের ফেসবুক পেইজ