পৃথিবীতে মানব সভ্যতার জন্য উপযোগী পরিবেশ বজায় রাখতে সহায়ক নয়টি প্রাকৃতিক ব্যবস্থার ওপর চাপ ক্রমশ বাড়ছে। পটসডাম ইনস্টিটিউট ফর ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট রিসার্চের প্ল্যানেটারি বাউন্ডারিজ সায়েন্স ল্যাবের ৬০ জনের বেশি বিজ্ঞানীর যৌথ গবেষণায় ‘প্ল্যানেটারি হেলথ চেক ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য। তারা জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে এই নয়টি প্ল্যানেটারি বাউন্ডারি বা গ্রহীয় সীমার মধ্যে সাতটিই অতিক্রম করেছে পৃথিবী। জলবায়ু, জীববৈচিত্র্য, মিঠাপানি এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক ব্যবস্থার ওপর এমন ক্রমবর্ধমান চাপ পরিবেশের অপরিবর্তনীয় পরিবর্তনের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন, বায়োস্ফিয়ার ইন্টেগ্রিটি বা জীববৈচিত্র্যের অখণ্ডতা, ভূমি ব্যবস্থার পরিবর্তন, মিঠা পানির পরিবর্তন, বায়োজিওকেমিক্যাল প্রবাহ, কৃত্রিম রাসায়নিক ও প্লাস্টিক এবং মহাসাগরের অম্লকরণের মতো বিষয়গুলো বর্তমানে নির্ধারিত নিরাপদ সীমা পার হয়ে গেছে। ২০০৯ সালে মানবজাতির জন্য একটি নিরাপদ পরিচালন স্থান বা ‘সেফ অপারেটিং স্পেস’ চিহ্নিত করার উদ্দেশ্যে এই কাঠামোটি প্রবর্তন করা হয়েছিল। আগের মূল্যায়নগুলোর তুলনায় মহাসাগরের অম্লকরণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ঝুঁকির মাত্রা বেড়েছে। তবে এখনো স্ট্রাটোস্ফিয়ারিক ওজোন ক্ষয় এবং বায়ুমণ্ডলীয় অ্যারোসল লোডিং—এই দুটি সীমা নিরাপদ মাত্রার মধ্যেই রয়েছে। বিশেষ করে ওজোনের অবস্থার কিছুটা উন্নতি লক্ষ্য করা গেলেও, পৃথিবীর কিছু অঞ্চলে বায়ুমণ্ডলীয় অ্যারোসল এখনও উদ্বেগের কারণ হিসেবে টিকে আছে।
গবেষক দল আমাজন রেইনফরেস্টের বর্তমান অবস্থা নিয়েও বিশেষ সতর্কতা জারি করেছেন। বৈশ্বিক জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে এবং কার্বন সংরক্ষণে আমাজনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশগত চাপের কারণে এই বনাঞ্চলের বড় একটি অংশ চরম সংকটের মুখে পড়েছে, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তা ও জলবায়ু স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন এবং জীববৈচিত্র্যের অবক্ষয়কে গবেষকরা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বিভাগ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, কারণ এখানে ক্ষতির মাত্রা অপরিবর্তনীয় হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
যদিও বর্তমান পরিস্থিতি বেশ শঙ্কার, তবুও বিজ্ঞানীরা এখনই আশা ছেড়ে দিচ্ছেন না। তাদের মতে, পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়নি। গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন দ্রুত কমিয়ে আনা এবং প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারলে পৃথিবীকে পুনরায় নিরাপদ সীমার কাছাকাছি ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তবে এর জন্য প্রয়োজন সময়োপযোগী এবং সুপরিকল্পিত বৈশ্বিক পদক্ষেপ।