যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে বড় ধরনের সামরিক হামলার হুমকি দেওয়ার পর তেহরান আন্তর্জাতিক মহলে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়ে দিয়েছে। পারমাণবিক কর্মসূচি এবং চলমান সংঘাত নিরসনের লক্ষ্যে নতুন প্রস্তাবের পাশাপাশি রাশিয়া, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের তথ্যমতে, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড ইরানে সামরিক অভিযান পরিচালনার জন্য ওয়াশিংটনের নির্দেশের অপেক্ষায় রয়েছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার অভিযান শুরুর পর থেকে মস্কো ও তেহরানের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। তবে এ বিষয়ে মস্কো আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানায়নি। যুদ্ধের সময় ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটির পাশাপাশি বেসামরিক ও জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ট্রাম্প সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের জানান, ইরানের বাকি অংশ ধ্বংস করার প্রয়োজন হতে পারে এবং এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত শীঘ্রই জানানো হবে। এর আগে হরমুজ প্রণালির কাছে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি ড্রোন ভূপাতিত করার ঘটনায় দুই দেশের উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করে। তেহরান দাবি করেছে, মার্কিন হামলার জবাব হিসেবেই তারা এই পদক্ষেপ নিয়েছে। কোনো ধরনের সামরিক আগ্রাসন চালানো হলে কঠোর প্রতিশোধ নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে ইরান। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে শাহেদ ড্রোন সরবরাহ করেছে ইরান।
চলমান উত্তেজনার মধ্যেই কাতারের মধ্যস্থতায় ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছে। তবে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সাতটি শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কোনো আলোচনায় তারা বসবে না। শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দ করা সম্পদ অবমুক্ত করা এবং হরমুজ প্রণালির কাছে ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া। নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজায়ি স্পষ্ট করেছেন যে, এসব দাবি না মানলে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে না।
কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে রেজায়ি গত বৃহস্পতিবার মস্কো সফর করে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তবে বার্তার বিষয়বস্তু প্রকাশ করা হয়নি।
সেখানে তিনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির একটি গোপন বার্তা হস্তান্তর করেন।
রেজায়ির দাবি, রাশিয়ার সঙ্গে গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে, যা ইরানের জ্বালানি সংকট নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এদিকে, বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, রাশিয়া ইরানকে ক্ষেপণাস্ত্র, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও সামরিক প্রযুক্তির তথ্য দিয়ে সহায়তা করছে। এদিকে, ইরানকে হেলিকপ্টার থেকে নিক্ষেপযোগ্য নির্ভুল নিশানার ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপক সরবরাহে রাশিয়ার সম্মতির কথা জানিয়েছে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে বৃহস্পতিবার সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কুয়েত ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন। এছাড়া কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান আল থানির সঙ্গে তিনি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও সমুদ্রপথে নিরাপদ নৌ চলাচল নিয়ে আলোচনা করেছেন। শুক্রবার কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলে বর্তমান সংকটের অবসানে চলমান প্রচেষ্টার বিষয়ে আলোচনা করেন।
তেহরান সতর্ক করে বলেছে, যদি যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে আক্রমণ চালায়, তবে তারা বিশাল পরিসরে পাল্টা জবাব দেবে। ইরানের সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, তাদের ক্ষেপণাস্ত্র উপসাগরীয় অঞ্চলের বাইরেও নির্দিষ্ট লক্ষ্যে আঘাত হানতে সক্ষম। আইআরজিসি আরও সতর্ক করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো দেশ বা বাহিনী সহায়তা করলে তারাও ইরানের বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচিত হবে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র বলছে, যেকোনো যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে।
বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়, যা বর্তমানে দুই শক্তির প্রধান বিবাদের কেন্দ্রবিন্দু। ইরান অভিযোগ করেছে, এই সপ্তাহে অনুমতি ছাড়া প্রবেশের সময় মাইনে আঘাত লেগে সাতটি ট্যাংকারে আগুন ধরেছে। শুক্রবার আরও দুটি ট্যাংকার একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে তাদের দাবি, যদিও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এসব ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেনি।
উল্লেখ্য যে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে ইরান ইস্যু ও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব রয়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। তবুও ট্রাম্প ইরানে হামলার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি। ইরানের সাবেক কূটনীতিক হাদি আফগাহির মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসন নমনীয়তা দেখালে সমঝোতার পথ তৈরি হতে পারে, তবে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের কঠোর অবস্থানের কারণে পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত। তার আশপাশে কঠোর অবস্থানের সমর্থকেরা রয়েছেন বলেও মন্তব্য করেন আফগাহি।