বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:৪৬ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
নরসিংদীতে গ্যাস সরবরাহ বন্ধের প্রতিবাদে দুই ঘণ্টা ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অবরোধ আজ সন্ধ্যা থেকেই বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতির আশা জ্বালানি প্রতিমন্ত্রীর মেজর সকার লিগের নতুন ঠিকানা খুঁজে নিলেন চিলির তারকা আলেক্সিস সানচেজ কাতারে সুলতান হাইথাম বিন তারিক: দুই দেশের সম্পর্ক জোরদারে আমির শেখ তামিমের সাথে বৈঠক তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ১০০০ কোটি টাকার তহবিল: জামানত ছাড়াই মিলবে ১০ লাখ টাকা ঋণ তরুণদের দক্ষ উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে ৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ ফান্ড: সমাজকল্যাণ মন্ত্রী উত্তর প্রদেশে গোমূত্র সংগ্রহে পাইলট প্রকল্প: কৃষকদের আয়ের নতুন পথ নাকি রাজনৈতিক বিতর্ক? ট্রাইব্যুনালে ওবায়দুল কাদের ও শেখ পরশের ফোনালাপ উপস্থাপন: কী কথা হয়েছিল তাদের? অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে খেলার সুযোগই বড় অনুপ্রেরণা, আত্মবিশ্বাসী শান্ত কাতারে গৃহহীন বিড়াল সংকট: কেনাকাটার বদলে দত্তক ও বন্ধ্যাকরণের ওপর জোর উদ্ধারকারীদের

দেশজুড়ে তীব্র লোডশেডিং: গ্যাস ও কয়লা সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ঘাটতি

প্রতিবেদকের নাম

দেশজুড়ে বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব প্রকট আকার ধারণ করেছে। গ্যাসের ঘাটতির কারণে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদন প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট কমে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কারিগরি ত্রুটি ও জ্বালানি স্বল্পতা। পিডিবি ও পিজিসিবি-এর তথ্য অনুযায়ী, গত সোমবার রাত ৮টা পর্যন্ত সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট, যা আগের দিন ছিল ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট। জুনে পাইকারি পর্যায়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ এবং গ্রাহক পর্যায়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলেও পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। এখনো পিডিবির কাছে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া পাওনা প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। তবু বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর এই বিপুল পাওনা পরিশোধ করতে পারছে না বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)।

সংশ্লিষ্টদের মতে, গত দেড় দশকে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পাইকারি পর্যায়ে ১২ বার ও খুচরা পর্যায়ে ১৪ বার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। জ্বালানি নিশ্চিত না করেই একের পর এক কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে, যার ফলে কেন্দ্রগুলো বসে থাকলেও ক্যাপাসিটি চার্জ গুনতে হচ্ছে। বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও সোমবার চাহিদার বিপরীতে ১৬ হাজার ২৬২ মেগাওয়াটের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হয়েছে মাত্র সাড়ে ১২ হাজার মেগাওয়াট। ২০২২ সাল থেকে প্রতিবছর গরম বাড়লেই দেখা দেয় লোডশেডিং। তবে বৃষ্টি নামলে বিদ্যুৎ চাহিদা কমে, মানুষ কিছুটা স্বস্তি পায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পিডিবির দুই দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সুফল পেতে অন্তত দুই মাস সময় লাগে। তাই বাড়তি আয় এখনো পিডিবির হিসাবে আসেনি। তবে দাম বাড়ানোর পর পিডিবির বকেয়া নতুন করে আর বাড়বে না বলে তারা আশা করছেন। এদিকে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে এখন মূল ভরসার জায়গা কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র। তবে তিনটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সরবরাহ কমেছে। রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য পটুয়াখালীর পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন অর্ধেকে নেমেছে। এছাড়া আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ১২ আগস্টের মধ্যে কয়লা সরবরাহ স্বাভাবিক হবে।

পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম জানান, গ্যাসের স্বল্পতা ও কয়লা সংকট থাকলেও তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র সারা দিন চালানো অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাই সন্ধ্যার পর লোডশেডিং সহনীয় রাখতে উৎপাদন বাড়ানো হয় এবং মধ্যরাতের পর উৎপাদন কমিয়ে লোডশেডিং বাড়ানো হয়। ঢাকার দুই বিতরণ সংস্থা ডেসকো ও ডিপিডিসি তাদের চাহিদার তুলনায় ঘাটতি না থাকলেও, আরইবি বা পল্লী বিদ্যুতের আওতাধীন গ্রামগুলোতে পরিস্থিতি ভয়াবহ। ফেনী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির এজিএম মোহাম্মদ বাইজিদ হোসেন শাহ জানান, ফেনীতে ১৫ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে। স্টারলাইন ফুড প্রোডাক্টের পরিচালক মো. মাইন উদ্দিন জানান, কারখানায় প্রতিদিন ৩৫ শতাংশ সময় লোডশেডিং থাকে।

নেত্রকোনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক আকরাম হোসেন জানান, ১৫৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে মাত্র ৫৯ মেগাওয়াট সরবরাহ পাওয়ায় ঘন ঘন লোডশেডিং করতে হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দা খালিদ জানান, ২৪ ঘণ্টায় গড়ে ৪-৫ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না। হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের দেউন্দি চা-বাগানের সহকারী ব্যবস্থাপক দেবাশীষ রায় জানান, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় চা-পাতা প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যাহত হচ্ছে। কেরানীগঞ্জের বাসিন্দারাও একই ভোগান্তিতে রয়েছেন। ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৪-এর মহাব্যবস্থাপক গোলাম কাউসার তালুকদার জানান, কেরানীগঞ্জে ২৪০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে প্রতিদিন ৮০ মেগাওয়াট ঘাটতি থাকছে।

নীলফামারীর ডোমার উপজেলায় লোডশেডিংয়ের কারণে জনমনে চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বিদ্যুৎ স্থাপনা ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তা চেয়ে থানায় লিখিত আবেদন করেছে নীলফামারী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। আবেদনে বলা হয়েছে, জাতীয় গ্রিডে উৎপাদন ও সরবরাহের ঘাটতির কারণে বরাদ্দ অনুযায়ী লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে, যা গ্রাহকদের দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে। ডোমার উপজেলা নেসকোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নওশাদ আলী জানান, প্রয়োজনের তুলনায় অর্ধেক বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে, ফলে গ্রাহকরা ২৪ ঘণ্টায় ১০ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না।

স্থানীয় বাসিন্দা নিলা জানান, প্রচণ্ড গরমে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়েছে, তার ওপর বিদ্যুতের আসা-যাওয়ার কোনো ঠিক ঠিকানা নেই। বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যমতে, দিনের অধিকাংশ সময় সক্ষমতার অর্ধেকের বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। গ্যাসের স্বল্পতা ও কয়লার সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় এই সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার ও নিয়মিত পুলিশ টহলের ব্যবস্থা করা হয়েছে যাতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটে।

বিদ্যুৎ সংকটের এই চক্র থেকে বের হতে জ্বালানি আমদানির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। তবে বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতি এবং বকেয়া পরিশোধের সক্ষমতা পিডিবির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্রাহক পর্যায়ে দাম বাড়ানোর পরও বিদ্যুৎ খাতের এই আর্থিক ও উৎপাদনগত সংকট কাটছে না। পিডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, পুরোনো বকেয়া ধাপে ধাপে শোধ করার পরিকল্পনা রয়েছে, কিন্তু বর্তমান জ্বালানি সংকট নিরসন না হওয়া পর্যন্ত লোডশেডিং থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন।

গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী আরইবি সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। তাদের বিতরণ এলাকাগুলোতে বিদ্যুৎ বিভ্রাট দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় কৃষিকাজ ও ক্ষুদ্র শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, দিনের বেলা বিদ্যুৎ না থাকায় মানুষ প্রচণ্ড গরমে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে এবং রাতেও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাচ্ছে না। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিদ্যুৎ বিভাগ সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।

বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা এবং জ্বালানি আমদানির ব্যয় পিডিবির আর্থিক কাঠামোকে দুর্বল করে দিয়েছে। যদিও দাম বাড়ানোর মাধ্যমে রাজস্ব বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে, তবে সেই অর্থ এখনো বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পাওনা পরিশোধে পর্যাপ্ত ভূমিকা রাখতে পারছে না। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো জ্বালানি সংকটে উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে, যা সরাসরি গ্রাহক পর্যায়ে লোডশেডিং হিসেবে প্রতিফলিত হচ্ছে।

সামগ্রিকভাবে, দেশের বিদ্যুৎ খাতের এই সংকট কেবল কারিগরি নয়, বরং আর্থিক ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনার সাথেও গভীরভাবে যুক্ত। সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে, তবে জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের এই ধারা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। গ্রাহকরা এখন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়ার অপেক্ষায় দিন গুনছেন।

একটি ইউনিটে রক্ষণাবেক্ষণ শুরু করায় ২ আগস্ট থেকে উৎপাদন অর্ধেকে নামে পটুয়াখালীর পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের।

যদিও কেন্দ্রটির পাওনা ৯ হাজার কোটি টাকার বেশি।

৭ আগস্ট থেকে উৎপাদন কমিয়েছে ভারতের ঝাড়খন্ডে নির্মিত আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র।

ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি পোহায় মানুষ।

রাতের বেলায় টানা কয়েক ঘণ্টা তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি চালালেও বেশির ভাগ সময় গড়ে দেড় হাজার মেগাওয়াটের কম চলছে তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র।

গত রোববার রাত থেকে আবার এটি চালু করে উৎপাদন বাড়াতে শুরু করেছে।

জনসংযোগ কোম্পানি ফাইভ ডব্লিউ কমিউনিকেশনসের মাধ্যমে মঙ্গলবার রাতে আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের পক্ষ থেকে জানিয়েছে, ১২ আগস্টের মধ্যে কয়লা সরবরাহ স্বাভাবিক হবে।

পিডিবি ও আরইবি মিলে ফেনী জেলার বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে ১৪০ মেগাওয়াট।

ফেনীর স্টারলাইন ফুড প্রোডাক্ট প্রাইভেট লিমিটেডের পরিচালক মো.

দিনে তো বিদ্যুৎ থাকেই না, প্রচণ্ড গরমে বিদ্যুৎ চলে গেলে বাচ্চারা ঘুম থেকে উঠে কান্নাকাটি শুরু করে।

এতে লোকসান গুনতে হচ্ছে বাগানগুলোকে।

গোলামবাজারের বাসিন্দা হাসান কবির টুটুল বলেন, দিনে তো বিদ্যুৎ থাকেই না, প্রচণ্ড গরমে বিদ্যুৎ চলে গেলে বাচ্চারা ঘুম থেকে উঠে কান্নাকাটি শুরু করে।

এতে গরমের সময়ে গ্রাহকদের দুর্ভোগ বেড়েছে।

নীলফামারী জেলা সদরের বাসিন্দা নিলা বলেন, ‘কয়েক দিন ধরি যে গরম পইচ্ছে, তাতে কাজ কাম করা কঠিন হইছে।

একবার গেইলে আইসার কোনো ঠিক ঠিকানা নাই।’

সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


আমাদের ফেসবুক পেইজ