বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:০৫ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
কাতারের ১৩৬ মসজিদে বৃষ্টির জন্য বিশেষ নামাজের ঘোষণা দক্ষিণ বাড্ডায় নিউ বি-বাড়িয়া বেকারিকে ১ লাখ টাকা জরিমানা পোশাক শিল্পে অস্থিরতা পরিকল্পিত রাজনৈতিক চক্রান্ত: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শীতকালে সর্বোচ্চ ছয়টি শৈত্যপ্রবাহের পূর্বাভাস আবহাওয়া অধিদপ্তরের যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে আবারও বিজয়ী হলেন সোমালীয় বংশোদ্ভূত ইলহান ওমর মানহীন মেডিকেল কলেজ স্থাপনে ছাড় নেই: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ২০২৭ সালে সরকারি ছুটি ২৯ দিন প্রযুক্তি মন্ত্রী: ডিসেম্বরের আগেই জাতীয় গ্রিডে আসতে পারে রূপপুরের বিদ্যুৎ ডেঙ্গুতে আরও ৬ জনের মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ১৮৬৬ ডিবিসি কার্যালয় থেকে ইকবাল সোবহানকে ডিবি কার্যালয়ে স্থানান্তর

নেত্রকোনায় সাংবাদিক নিহতের ঘটনায় তদন্তে উঠে আসছে নতুন নানা সূত্র

প্রতিবেদকের নাম

নেত্রকোনার দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা সীমান্ত অঞ্চলের অবৈধ চোরাচালান, মাদক ব্যবসা এবং বিভিন্ন অসাধু কারবার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অনুসন্ধানমূলক সংবাদ প্রচার করতেন সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির। নিজের পরিচালিত ফেসবুক পেজ ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’-এ তিনি নিয়মিত এসব ঘটনার স্থিরচিত্র, ভিডিও এবং তথ্য-প্রমাণ তুলে ধরতেন। চাঞ্চল্যকর এই অপরাধ জগতের ‘গডফাদারদের’ বিষয়ে নতুন তথ্য প্রকাশের ঘোষণা দেওয়ার ঠিক পরদিন ১৫ অক্টোবর রাতে তিনি হামলার শিকার হন। দুর্গাপুরের বিরিশিরি ইউনিয়নের তেলনজিয়া এলাকায় নিজের শ্বশুরবাড়ির কাছে একটি দোকানের সামনে দুর্বৃত্তদের গুলিতে প্রাণ হারান এই গণমাধ্যমকর্মী। তিনি বলেন, ‘তদন্তের স্বার্থে এখনই কিছু বলছি না।

পরিবার ও স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, সীমান্তের চোরাচালান চক্রের সঙ্গে সাংবাদিক আলিফের দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে তিনি আগে থেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবগত করেছিলেন। পুলিশ বলছে, এখন পর্যন্ত এই বিরোধের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সরাসরি সম্পৃক্ততা নিশ্চিত হওয়া না গেলেও, তদন্তে কয়েকজন চিহ্নিত অপরাধী এবং তাদের সঙ্গে আলিফের দ্বন্দ্বের বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথাও তিনি পুলিশকে জানিয়েছিলেন। সীমান্তের ব্যবসা ও আধিপত্য নিয়ে বিরোধের জেরে ওই হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল বলে সে সময় অভিযোগ ওঠে। এ কারণেই দুর্বৃত্তরা তাঁকে গুলি করে হত্যা করেছে বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, ‘এই হত্যা মামলাটি নিয়ে আমরা অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছি। অতি দ্রুত সময়ের মধ্যেই আপনাদের সামনে সবকিছু প্রকাশ করব। এ সময় একজন অপরাধীর পাসপোর্ট জব্দ করা হয়।

তদন্তকারী সংশ্লিষ্টদের মতে, দুর্গাপুরের বিতর্কিত ব্যক্তিদের মধ্যে শামীম আহমেদ ওরফে শুটার শামীম এবং তাজুল ইসলামের নাম বারবার সামনে আসছে। এর দুই বছর পর, ২০২৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি নলজোরা গ্রামের মবিবুর রহমান ওরফে দা মজিবুর নিহত হন। ওই মামলাতেও শামীমকে প্রধান আসামি করা হয়।

স্থানীয়দের ভাষ্য, আলিফের পেজে তাদের নিয়ে লেখালেখির কারণে সম্পর্কের চরম অবনতি হয়েছিল।

যদিও শামীম ও তাজুলের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে পুলিশ এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি।

মামলার নথি অনুযায়ী, শামীমের বিরুদ্ধে ২০১৪ সাল থেকে বিভিন্ন অভিযোগে অন্তত ২৯টি এবং তাজুলের বিরুদ্ধে ১৬টি মামলা রয়েছে। এসব মামলার মধ্যে এসআই শফিকুল ইসলাম হত্যা এবং সাবেক চেয়ারম্যান সুব্রত সাংমা হত্যাকাণ্ডের মতো গুরুতর ঘটনার অভিযোগও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ জানান, শামীমের বিরুদ্ধে ২০১৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে বিভিন্ন অভিযোগে অন্তত ২৯টি মামলা হয়েছে। পুলিশের তথ্যমতে, ২০২২ সালের ৮ অক্টোবর কুল্লাগড়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নেতা সুব্রত সাংমা হত্যা মামলায় শামীমের নাম আসে।

শামীম সম্পর্কে স্থানীয়দের বিভিন্ন প্রশ্ন থাকলেও, তার সৎভাই ও কুল্লাগড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল আউয়াল এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। অন্যদিকে, হত্যাকাণ্ডের পর থেকে শামীম ও তাজুলকে এলাকা ছাড়া বা আত্মগোপনে থাকতে দেখা গেছে। তাদের ব্যক্তিগত মুঠোফোন বন্ধ থাকায় এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তারা বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করে আত্মগোপনে চলে যান।

মেঘালয় সীমান্তঘেঁষা দুর্গাপুরে পাথর, বালু ও মাদক চোরাচালানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মহলের মধ্যে অস্থিরতা ও আধিপত্য বিস্তারের লড়াই চলছে। এসব বিষয় নিয়ে নিয়মিত অনুসন্ধানের কারণে আলিফ অবৈধ কারবারিদের রোষানলে পড়েছিলেন বলে তাঁর সহকর্মীরা দাবি করছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সহকর্মী জানান, আলিফের সাহসী লেখালেখি অনেককে অস্বস্তিতে ফেলেছিল, যার জের ধরে অতীতেও তিনি হামলার শিকার হয়েছেন। যাঁদের নিয়ে তিনি লেখালেখি করতেন, তাঁদের কেউ কি হত্যার পরিকল্পনায় যুক্ত।

উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর দুর্গাপুরের সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করা হয়েছিল আলিফকে। ওই ঘটনার পর তিনি নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশের শরণাপন্ন হন। একই বছরের ৩০ নভেম্বর পুলিশ সুপারের সঙ্গে সাংবাদিকদের এক মতবিনিময় সভায় তিনি সীমান্তবর্তী অপরাধীদের তৎপরতা ও নিজের জীবনের ঝুঁকির কথা সরাসরি তুলে ধরেছিলেন। মৃত্যুর প্রায় ১১ মাস আগে করা সেই সতর্কবার্তা এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

হত্যার ঠিক আগের দিন ফেসবুকে আলিফ লিখেছিলেন, ‘আগামীকাল চাঞ্চল্যকর অপরাধের গডফাদারের তথ্য প্রমাণ’। এমনকি মৃত্যুর মাত্র দুই ঘণ্টা আগে ৪১ সেকেন্ডের একটি ভিডিও প্রকাশ করে তিনি রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন সংক্রান্ত এক প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেছিলেন। তাঁর স্ত্রী আনন্দিতা সাংমার মতে, আলিফের ব্যক্তিগত মুঠোফোনে থাকা যোগাযোগের রেকর্ড, ইনবক্সের তথ্য ও অনুসন্ধানের নথিগুলো রহস্য উদঘাটনে মূল চাবিকাঠি হতে পারে। হত্যার সঙ্গে এসবের যোগসূত্র আছে কি না, তদন্তেই তা বেরিয়ে আসবে।’। ৪১ সেকেন্ডের ওই ভিডিওর সঙ্গে লেখা ছিল, ‘নেত্রকোনায় রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের গডফাদার বাবুল।’। আলিফের ফোনের কলতালিকা, বার্তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইনবক্স, ভিডিও ও ছবির উৎস এবং সাম্প্রতিক যোগাযোগের তথ্য তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে।

ময়নাতদন্তে আলিফের শরীরে ছয়টি গুলির ক্ষত পাওয়া গেছে। ঘটনার পর তাঁর স্ত্রী বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের নামে মামলা দায়ের করেন। এ মামলায় পুলিশ এখন পর্যন্ত তাজুলের সহযোগী হিসেবে পরিচিত সাজিবুল ইসলাম ওরফে অপূর্বকে গ্রেপ্তার করেছে, যাকে চার দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। আদালত অপূর্বর চার দিনের পুলিশ রিমান্ড মঞ্জুর করেন। একটু অপেক্ষা করুন, সবকিছুই জানাতে পারব।’।

ময়মনসিংহ রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান জানিয়েছেন, এই হত্যাকাণ্ডটি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে এবং অনেকদূর অগ্রগতি হয়েছে। নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম জানান, ১৯ অক্টোবর গভীর রাতে পুলিশ, এসআরবি ও বিজিবি যৌথভাবে সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করেছে। স্থানীয়দের দাবি, আলিফ হত্যার কারণ এবং প্রকৃত নেপথ্য কারিগরদের চিহ্নিত করতে নিরপেক্ষ ও কঠোর তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


আমাদের ফেসবুক পেইজ