চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার খন্দকারপাড়া এলাকায় গত বছরের ৫ নভেম্বর এক চাঞ্চল্যকর হামলার ঘটনা ঘটে। কেউ স্লোগান দিচ্ছিলেন, কেউ বিলি করছিলেন প্রচারপত্র। নিজের এলাকায় এমন হামলার আশঙ্কা করেননি সরোয়ার।
বিএনপির তৎকালীন সংসদ সদস্য প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর নির্বাচনী গণসংযোগ চলাকালে জনাকীর্ণ এলাকায় অতর্কিতে এক যুবক পিস্তল ঠেকিয়ে সরোয়ার হোসেন ওরফে বাবলাকে গুলি করে। এর মধ্যেই এক যুবক পেছন থেকে গণসংযোগে থাকা এক ব্যক্তির ঘাড়ে পিস্তল ঠেকিয়ে পরপর তিনটি গুলি করেন। চট্টগ্রাম-৮ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর নির্বাচনী গণসংযোগে তাঁকে গুলি করা হয়। গুলি করার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণে সরোয়ার সতর্কভাবে চলাফেরা করতেন। এ জন্য নির্বাচনী জনসংযোগের মতো জনসমাগমপূর্ণ স্থানকে বেছে নেওয়া হয়।
ঘটনার আকস্মিকতায় উপস্থিত সবাই ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়লে হামলাকারী দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
পরে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলে সরোয়ারের মৃত্যু হয়। পরে গুরু-শিষ্যের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়।
আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের এক বছর পূর্ণ হলেও মূল সেই শুটারকে শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছে।
নিহত সরোয়ার হোসেন নগরের একজন তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ছিলেন, যার বিরুদ্ধে হত্যা ও চাঁদাবাজিসহ ১৫টি মামলা ছিল। সেই নির্বাচনী প্রচারণায় এরশাদ উল্লাহসহ আরও পাঁচজন গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন। বর্তমানে এরশাদ উল্লাহ সংশ্লিষ্ট আসনের সংসদ সদস্য এবং মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত মোট ৩৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, কিন্তু হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্রটি এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশের ভাষ্যমতে, এলাকা নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দীর্ঘদিনের পূর্ববিরোধের জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। পুলিশের ভূমিকা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
ঘটনার ভিডিও ফুটেজে বাঁ হাতে পিস্তল চালানো এক যুবককে দেখা গেলেও তার মুখ স্পষ্ট ছিল না। সিসিটিভি ক্যামেরার অনুপস্থিতি এবং অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে স্থান নির্বাচনের কারণে শুটারের পরিচয় নিশ্চিত করা পুলিশের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তদন্তকারীদের ধারণা, শুটার সম্ভবত ২০ থেকে ২৫ বছর বয়সী এবং অত্যন্ত প্রশিক্ষিত।
নিহতের বাবা আবদুল কাদের জানিয়েছেন, ঘটনার তিন দিন আগে মো. রায়হান নামে এক ব্যক্তি সরোয়ারকে হুমকি দিয়েছিলেন। আবদুল কাদেরের অভিযোগ, বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী, সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ এবং মো. রায়হান নিয়মিত তার ছেলেকে ভয়ভীতি দেখাতেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ঘটনার পরদিন থানায় সাতজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ১৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন তিনি। এ সময় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন ওই ব্যক্তি। সরোয়ারকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছিল, তাঁর সময় শেষ।
মামলার এজাহারভুক্ত প্রধান আসামিদের মধ্যে সাজ্জাদ, রায়হান ও বোরহান এখনো পলাতক রয়েছেন। গত ২৯ আগস্ট যশোর সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালানোর সময় মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বর্তমানে সরোয়ার হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার ৩৯ জনের মধ্যে ১০ জন কারাগারে রয়েছেন এবং অন্যরা জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। বায়েজিদ বোস্তামী থানার ওসি ইখতিয়ার উদ্দিন জানিয়েছেন, শুটারকে শনাক্ত করতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। সরোয়ার হত্যা মামলায় গত ২৮ অক্টোবর আদালত তাঁর দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। সুষ্ঠু তদন্ত করে পুলিশ বের করুক।’। তাঁর অভিযোগ, ৩৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও প্রকৃত অপরাধীদের অনেকে ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন।
নিহতের ভাই ও বায়েজিদ থানা শ্রমিক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজ উদ্দিনের দাবি, রাজনৈতিক বিরোধের কারণেই তার ভাইকে প্রাণ দিতে হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, প্রভাবশালী কোনো মহলের মদদপুষ্ট হয়েই এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। তবে রাজনৈতিক বিরোধের বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয় বলে জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, এখন পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্যে আধিপত্য বিস্তারকেই মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষের ভিড়ের মধ্যেই হঠাৎ গুলির শব্দ। যদিও নেপথ্যে রাজনৈতিক বিরোধও থাকতে পারে বলে ধারণা পরিবারের।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সাল থেকে সরোয়ার ও বড় সাজ্জাদের মধ্যে আধিপত্য নিয়ে দ্বন্দ্ব চলে আসছিল। এর আগেও গত বছরের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এলাকায় সরোয়ারকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়েছিল, যেখানে তিনি অল্পের জন্য বেঁচে গেলেও দুজন নিহত হন। মামলার বাদী আবদুল কাদের ছেলের হত্যাকারীদের বিচার চেয়ে এখনো হতাশ। তিনি বলেন, চোখের সামনে ঘটে যাওয়া এই নির্মম ঘটনার মূল শুটার এখনো ধরা না পড়ায় বিচার প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন। পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, সরোয়ার একসময় বড় সাজ্জাদের অনুসারী ছিলেন। ২০১৬ সালের দিকে সরোয়ার নিজস্ব বলয় গড়ে তোলেন। এর পর থেকে এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুজনের বিরোধ চলছিল।