পারিবারিক সম্পর্ক ও সম্পত্তির অধিকার নিয়ে আপন ভাইয়ের বিরুদ্ধে বঞ্চনা, ভয়ভীতি এবং মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছেন কয়েকজন নারী। তাঁদের ভাষ্যমতে, শৈশবের প্রিয় ভাই মা-বাবার মৃত্যুর পর অনেকের ক্ষেত্রেই নিরাপত্তাহীনতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন। পারিবারিক সহিংসতার আলোচনায় সাধারণত স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের নির্যাতনের চিত্র উঠে এলেও, পরিবারের আপন সদস্যদের হাতে নারীর বঞ্চনার এই চিত্রটি এখন নতুন করে সামনে আসছে।
৪৪ বছর বয়সী একজন নারী উদ্যোক্তা জানিয়েছেন, মা-বাবার মৃত্যুর পর থেকে তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। তাঁর বাবা ২০০০ সালে এবং মা ২০১৯ সালে মারা যান। মা-বাবার রেখে যাওয়া উত্তরায় মায়ের কেনা ১ হাজার ২০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট দুই ভাই-বোন সমান ভাগে নেবেন—এমনটাই মৌখিকভাবে নির্দেশ ছিল। কিন্তু সম্পদ ভাগাভাগি না হওয়ায় এবং ভাইয়ের আচরণে অতিষ্ঠ হয়ে গত ১৮ জুন তিনি ভাইয়ের বিরুদ্ধে আইনি নোটিশ পাঠান। এরপর থেকে ভাই তাঁকে ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন বলে অভিযোগ তাঁর।
উক্ত নারী আরও জানান, ২৬ জুন রাতে ভাই তাঁর উত্তরার বাসায় গিয়ে আইনি নোটিশ প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেন। রাজি না হওয়ায় তাঁকে মারধরের চেষ্টা করা হয়। এ ঘটনায় তিনি থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন এবং মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি বলেন, এটি কেবল ফ্ল্যাটের মালিকানা নয়, বরং নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি উদাহরণ তৈরি করতে চান তিনি।
অন্যদিকে, অভিযুক্ত ভাই ২৪ আগস্ট জানিয়েছেন, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। তিনি কোনো হুমকি দেননি, বরং বোনের দুর্ব্যবহারের শিকার হচ্ছেন বলে দাবি করেন। ফ্ল্যাটের বিষয়ে তাঁর ভাষ্য, মা মৌখিকভাবে সমান ভাগের কথা বললেও এর কোনো লিখিত দলিল নেই। উত্তরা পশ্চিম থানার এসআই মহসিন হাসান জানান, বিষয়টি তদন্তের জন্য আদালতের অনুমতির প্রয়োজন রয়েছে।
আরেকটি ঘটনায় ৪৫ বছর বয়সী এক ফ্রিল্যান্স পরামর্শক জানিয়েছেন, ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার পর তাঁর ভাইয়ের আচরণ বদলে যায়। রাজশাহীর ৫৪ লাখ টাকার বাড়ি বিক্রির পুরো টাকা ভাই নিয়ে নিয়েছেন এবং চট্টগ্রামের ফ্ল্যাট বিক্রির টাকারও অংশ পাননি বলে তাঁর অভিযোগ। যদিও ২০২৪ সালে বিদেশে যাওয়ার আগে ভাই ফ্ল্যাটের নিজের অংশ বোনের নামে হেবা করে দেন, তবুও দীর্ঘদিনের তিক্ততায় তাঁদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।
পারিবারিক সহিংসতার শিকার হওয়া অন্য এক স্কুলশিক্ষক জানান, স্বামীর মৃত্যুর পর সন্তান নিয়ে মা-বাবা ও ভাইয়ের ফ্ল্যাটে আশ্রয় নিলে ভাইয়ের আচরণ চরম আকার ধারণ করে। ফ্ল্যাট কেনার সময় নিজের টাকা দেওয়ার কথা উল্লেখ করায় ভাইয়ের রোষানলে পড়েন তিনি। এছাড়া ঢাকার বাইরের এক নারী অভিযোগ করেছেন, ১০ বছর ধরে ভাইয়েরা তাঁকে পৈতৃক বাড়িতে ঢুকতে দিচ্ছেন না এবং এলাকায় হেনস্তা করছেন। প্রতিকার চেয়ে তিনি জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদনও করেছিলেন।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের লিগ্যাল অ্যাডভোকেসি ও লবি পরিচালক দীপ্তি শিকদার বলেন, অনেক পরিবারে বাবা বা ভাইয়ের হাতে যৌন নিপীড়ন কিংবা মা-বাবার ভরণপোষণ না দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটে। তিনি উত্তরাধিকার আইনে সমতা প্রতিষ্ঠা এবং পরিবারে ছেলেমেয়েকে সমান অধিকার দিয়ে বড় করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ৩৫টি ঘটনায় নারী ও শিশু নিজ পরিবারের সদস্যদের হাতে সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া পারিবারিক সহিংসতাকে কেন্দ্র করে ৬৭ জন আত্মহত্যা করেছেন, যাদের মধ্যে ৪৪ জনের বয়স ১৯ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে।
পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০ অনুযায়ী, পারিবারিক সম্পর্কের কারণে কোনো সম্পদ বা সুযোগ-সুবিধায় অধিকার থাকা সত্ত্বেও কাউকে বঞ্চিত করা বা বাধা দেওয়া অপরাধ। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আদালত সুরক্ষা আদেশ ও ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দিতে পারেন। সুরক্ষা আদেশ লঙ্ঘনের শাস্তি সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছি’—কথাগুলো বলতে বলতে কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে ৪৪ বছর বয়সী ওই নারীর। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিশেষ করে মা-বাবার মৃত্যুর পর একা হয়ে পড়া এমন নারীদের কেউ কেউ আপন ভাইয়ের কাছেই বঞ্চনা, অপমান, ভয়ভীতি কিংবা সম্পদ থেকে অধিকার হারানোর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সামাজিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও যুক্ত। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তাঁর বাবা ছিলেন রাষ্ট্র মালিকানার একটি ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, মা সরকারি স্কুলের শিক্ষক। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সেই সম্পদের ভাগ চাওয়ার কারণেই পারিবারিক সহিংসতা শুরু। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পরে ৮ জুলাই তাঁর ভাই আইনি নোটিশের জবাব পাঠান।