বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দুই দফা ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল। গতকাল নয়াদিল্লিতে আয়োজিত সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে তিনি এ তথ্য নিশ্চিত করেন। জয়সওয়াল জানান, গত ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রীকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ দেওয়া হয়েছিল এবং পরবর্তীতে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস আউটরিচ সেশনেও তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। এই আমন্ত্রণগুলোর বিষয়ে নতুন কোনো আপডেট থাকলে তা পরবর্তীতে জানানো হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এর আগে, বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী গতকাল নয়াদিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে একান্ত বৈঠক করেন। তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের একদিন পরই তিনি মোদির সঙ্গে এই আলোচনা করলেন। সোমবার ঢাকা ছাড়ার আগে ত্রিবেদী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন এবং রোববার পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গেও আলোচনা করেন। ভারতীয় হাইকমিশনের ফেসবুক পোস্ট অনুযায়ী, ত্রিবেদী ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে মোদির দিকনির্দেশনা চেয়েছেন।
তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের সময় ভারতীয় হাইকমিশনার মোদির শুভেচ্ছাবার্তা পৌঁছে দেন এবং দুই দেশের মধ্যে গঠনমূলক ও ভবিষ্যতমুখী সম্পর্কের বিষয়ে ভারতের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তথ্যমতে, ওই বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ও পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে ঢাকা থেকে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের আনুষ্ঠানিক দাবি জানানো হয়। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনা দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় এই দাবি তোলা হয়েছে।
একইসঙ্গে, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি হত্যায় জড়িত অভিযুক্তদের ফেরত দেওয়ার দাবিও জানিয়েছে বাংলাদেশ। এছাড়া, নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক গণমাধ্যম উপস্থিতি নিয়ে ঢাকা তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। গত ৫ আগস্ট জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে শেখ হাসিনা এক গণমাধ্যম অনুষ্ঠানে ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন, যা বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলে ঢাকা মনে করে।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রসঙ্গে রণধীর জয়সওয়াল বলেন, এ বিষয়ে ভারতের অবস্থান আগেই জানানো হয়েছে এবং প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী ভারত বিষয়টি পরীক্ষা করছে। শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলাটি একটি বিচারিক প্রক্রিয়া এবং এর তদন্ত চলমান রয়েছে বলেও তিনি জানান।
এদিকে, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে সরকার তার পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং তাকে সব ধরনের আইনি ও সাংবিধানিক অধিকার প্রদান করে বিচারের মুখোমুখি করা হবে। তিনি বলেন, আদালতের রায় সবাইকে মেনে নিতে হবে এবং রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে অভিযুক্তদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা হবে।
সাকিব আল হাসান প্রসঙ্গে জাহেদ উর রহমান বলেন, তিনিও পূর্ণ নিরাপত্তায় দেশে ফিরে অভিযোগের মুখোমুখি হতে পারবেন। তবে তিনি সাকিবকে হাসিনার সহযোগী হিসেবে অভিহিত করে কঠোর সমালোচনা করেন। এছাড়া, ভবিষ্যতে কোনো ফ্যাসিবাদী বা মাফিয়া শাসন হতে দেওয়া হবে না বলে তিনি দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
সম্প্রতি ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর প্রধান পরাগ জৈনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করেছে। এই সফর এবং ত্রিবেদীর নয়াদিল্লি যাত্রা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনার প্রেক্ষিতে জাহেদ উর রহমান মানুষকে অনুমাননির্ভর মন্তব্য না করার আহ্বান জানান। তিনি একে দুই দেশের গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগের অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে তিনি স্পষ্ট করেন যে, হাসিনা সরকারের সময় ভারতীয় সংস্থাগুলো যেভাবে কাজ করত, ভবিষ্যতে তা আর গ্রহণযোগ্য হবে না।
বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার তারেক রহমানের আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জানিয়েছেন, বিমসটেকের সভাপতি হিসেবে তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ঢাকা হয়তো তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় সফর এবং ব্রিকস সম্মেলনে অংশগ্রহণের বিষয়টিকে সমন্বয় করার চেষ্টা করছে।
এতে ঢাকার পক্ষ থেকে তীব্র আপত্তি জানানো হয়।
জাহেদ বলেন, ‘তিনি হয়তো একজন ভালো খেলোয়াড়, কিন্তু তিনি একজন নষ্ট ও পচা মানুষ, যিনি হাসিনার সঙ্গে জোটবদ্ধ ছিলেন এবং এখনো আছেন।’
বৈঠকে দুই পক্ষ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছে।’
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছে।
তবে ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর সম্পর্কের কিছুটা উন্নতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই হোক না কেন, গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিসহ সবার সাংবিধানিক ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা হবে।’