গত সপ্তাহে প্রকাশিত ২০২৬ সালের বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচক (গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স—জিএইচআই) প্রতিবেদনে ক্ষুধা ও অপুষ্টি মোকাবিলায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের ধারাবাহিক অগ্রগতির চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০০ সালের পর থেকে ভারত, বাংলাদেশ ও নেপাল ক্ষুধা মোকাবিলায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি অর্জন করেছে। তবে পাকিস্তানের ক্ষেত্রে এই অগ্রগতির ধারা বাধাগ্রস্ত হয়েছে এবং দেশটিতে পরিস্থিতির বরং অবনতি ঘটেছে।
সূচক অনুযায়ী, বাংলাদেশের বর্তমান স্কোর ১৯ দশমিক ২। এই স্কোর মাঝারি মাত্রার ক্ষুধা পরিস্থিতির নির্দেশক। অন্যদিকে, ভারতের স্কোর ২৪ দশমিক ১ এবং পাকিস্তানের স্কোর ২৫ দশমিক ৫, যা উভয় দেশেই গুরুতর ক্ষুধা পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেয়। ২০১৮ সালে পাকিস্তানের ক্ষুধা সূচকের স্কোর ছিল ২৪ দশমিক ০, যা বর্তমানে বেড়ে ২৫ দশমিক ৫ হওয়ায় দেশটির খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টি পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বর্তমানে ১২২টি দেশের মধ্যে পাকিস্তানের অবস্থান ১০৬তম। তালিকায় দেশটির চেয়ে বেশি স্কোর রয়েছে আফগানিস্তান, সিয়েরা লিওন ও সিরিয়ার মতো রাষ্ট্রগুলোর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের সাফল্যের মূলে রয়েছে নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবার ব্যাপক বিস্তার।
লন্ডনভিত্তিক আর্থিক বিশ্লেষক জাভেদ হাসান নিক্কেই এশিয়াকে জানান, দেশের তৈরি পোশাক খাত নারীদের কর্মসংস্থানে বড় ভূমিকা রেখেছে।
একইসঙ্গে কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং মেয়েদের শিক্ষার হার বাড়ানো ক্ষুধার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাফল্যের বড় নিয়ামক হয়েছে। ইসলামাবাদভিত্তিক অর্থনীতিবিদ নিয়াজ মুর্তাজাও স্বীকার করেছেন যে, বাংলাদেশের এই উন্নয়ন মডেল ক্ষুধা মোকাবিলায় কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। পাশাপাশি কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীরা মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিয়েছেন।
বিপরীতে পাকিস্তানে খাদ্যপণ্যের আকাশচুম্বী দাম, শিশুদের অপুষ্টি, কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং জলবায়ুজনিত দুর্যোগ পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় বর্তমান পরিস্থিতির বিচারে শ্রীলঙ্কা ও নেপাল বাংলাদেশের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে।
ওয়েলথাঙ্গারহিলফে, হেলভেটাস এবং রুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সশস্ত্র সংঘাতবিষয়ক আন্তর্জাতিক আইন ইনস্টিটিউটের যৌথ উদ্যোগে এই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। এতে ক্ষুধা নির্ধারণে চারটি সূচক ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে অপুষ্টি ও শিশুমৃত্যুর হারের জন্য ৩৩ দশমিক ৩ শতাংশ করে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এছাড়া শিশুদের বয়সের তুলনায় উচ্চতা কম হওয়া এবং উচ্চতার তুলনায় ওজন কম হওয়ার সূচকে ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ করে গুরুত্ব আরোপ করা হয়।
বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকে শূন্য থেকে ১০০-এর মধ্যে স্কোর নির্ধারণ করা হয়। স্কোর ১০-এর কম হলে ক্ষুধার মাত্রা কম হিসেবে ধরা হয়। ১০ থেকে ১৯ দশমিক ৯ পর্যন্ত মাঝারি, ২০ থেকে ৩৪ দশমিক ৯ পর্যন্ত গুরুতর, ৩৫ থেকে ৪৯ দশমিক ৯ পর্যন্ত আশঙ্কাজনক এবং ৫০ বা তার বেশি স্কোর অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বলে বিবেচিত হয়। এই মানদণ্ডেই বাংলাদেশ মাঝারি এবং পাকিস্তান গুরুতর ক্ষুধার তালিকায় অবস্থান করছে।