দিল্লিতে ১২ থেকে ১৩ই সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয়েছে ১৮তম ব্রিকস (BRICS) শীর্ষ সম্মেলন। পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থা, বহুমেরুকেন্দ্রিক ভূরাজনীতি এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের এই সময়ে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মঞ্চে আমন্ত্রণ পেয়েও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতি জাতীয় স্বার্থের বিচারে গভীরভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে। ব্রিকসের ১১টি সদস্য রাষ্ট্র ছাড়াও জাতিসংঘের মহাসচিবসহ বিশ্বের অনেক প্রভাবশালী সংস্থা ও জোটের প্রতিনিধিরা এই সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। এমন একটি প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ না থাকাটা এই বৈশ্বিক গুরুত্ব অনুধাবন এবং কূটনৈতিক তাৎপর্যকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সক্রিয় ভূমিকার ঘাটতি হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল গত ৪ঠা আগস্ট জানিয়েছিলেন যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দুটি পৃথক আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এর একটি ছিল ফেব্রুয়ারি-২০২৬ এ দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারত সফরের দ্বিপক্ষীয় আমন্ত্রণ এবং অন্যটি ছিল বিমসটেকের (BIMSTEC) বর্তমান চেয়ার হিসেবে ১২ থেকে ১৩ই সেপ্টেম্বর ব্রিকস আউটরিচ সেশনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, আসিয়ান বা বিমসটেকের মতো আঞ্চলিক সংগঠনের নেতৃত্বদানকারী রাষ্ট্র বা সংস্থাকে ব্রিকস আউটরিচ সেশনে আমন্ত্রণ জানানো তাদের একটি প্রচলিত রীতি।
তবে ১০ই সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ব্যাখ্যা প্রদান করেন। তিনি জানান, “আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি, বিমসটেক চেয়ারকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।” তিনি আরও পরিষ্কার করেন যে, প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ভারত সফর কোনোভাবেই বহুপক্ষীয় সফর হতে পারে না এবং দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য এটি উপযুক্ত পরিবেশ নয়। একই সঙ্গে তিনি প্রধানমন্ত্রীর ব্রিকস সম্মেলনে অংশগ্রহণের সম্ভাবনা সরাসরি নাকচ করে দেন। সরকারের ঘোষিত “সবার আগে বাংলাদেশ” দর্শনের আলোকে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রত্যাশা থাকলেও, এই বহুপক্ষীয় কূটনৈতিক সুযোগ হাতছাড়া হওয়া নিয়ে নীতিগত অসামঞ্জস্যের প্রশ্ন উঠেছে।
প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ে এই অনুপস্থিতির ফলে বাংলাদেশ একটি বড় বহুপক্ষীয় মঞ্চে সরাসরি উপস্থিতির সুযোগ হারিয়েছে। এর মাধ্যমে বিমসটেকের চেয়ার হিসেবে আঞ্চলিক স্বার্থ তুলে ধরা, ব্রিকস সদস্য ও অংশীদার রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে মতবিনিময় এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতার পরিসর বাড়ানোর সুযোগটিও হাতছাড়া হয়েছে। কোনো কারণে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে সরাসরি অংশ নেওয়া সম্ভব না হলেও, জাতীয় স্বার্থে এমন গুরুত্বপূর্ণ मंचে অন্তত একজন উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি পাঠানোর ব্যবস্থা রাখা যেত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে ‘ভারত বনাম চীন’ কিংবা ‘পশ্চিম বনাম বৈশ্বিক দক্ষিণ’-এর মতো কৃত্রিম দ্বৈততার বাইরে রেখে জাতীয় স্বার্থকেই সম্পর্কের প্রধান মাপকাঠি হিসেবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। “সবার আগে বাংলাদেশ” দর্শনটির বাস্তব অর্থ হওয়া উচিত জাতীয় স্বার্থনির্ভর কূটনীতি। ব্রিকসের মতো গুরুত্বপূর্ণ বহুপক্ষীয় পরিসরে প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতি যদি কূটনৈতিক নীতির ধারাবাহিকতায় পরিণত হয়, তবে তা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক পরিসর সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে জাতীয় স্বার্থের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের মূল্য দিতে হতে পারে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: যুদ্ধের মধ্যে থাকা সত্ত্বেও রাশিয়া ও ইরানের প্রেসিডেন্ট BRICS সম্মেলনে সরাসরি উপস্থিত হয়েছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এতে এই সম্মেলনের বৈশ্বিক গুরুত্ব সহজেই অনুধাবন করা যায়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ফলে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ বললেও এই সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের স্বার্থই শেষ পর্যন্ত কতোটা সুরক্ষিত হয়েছে—সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একজন প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে তার দেশের সরকারপ্রধান এবং কোনো আঞ্চলিক সংগঠনের চেয়ার হতে পারেন—তাই তার কাছে আসা দু’টি আমন্ত্রণের প্রাতিষ্ঠানিক চরিত্র ভিন্ন হওয়াই স্বাভাবিক। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বাংলাদেশ কি তার আঞ্চলিক নেতৃত্বের এই কূটনৈতিক দায়িত্বকে একটি বৃহত্তর বহুপক্ষীয় মঞ্চে উপস্থাপন করার সুযোগ নেবে, নাকি আমন্ত্রণের প্রকৃতি নিয়ে আপত্তির কারণে পুরো সুযোগটিই ছেড়ে দেবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: BRICS কোনো সামরিক জোট নয়, NATO-ধরনের নিরাপত্তা কাঠামোও নয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এটি এখন উদীয়মান ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্ল্যাটফরম।