ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে একটি সরকারি অধিদপ্তরে রূপান্তরের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করেছে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়।
এই পুনর্গঠন উদ্যোগের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয় থেকে শুরু করে বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত নতুন জনবল ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত কাঠামোর খসড়া তৈরি করে পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব পাঠাতে বলা হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষ থেকে এটিকে অধিদপ্তরে রূপান্তরের দাবি জানানো হচ্ছিল। প্রস্তাবিত এই সংস্কার বাস্তবায়িত হলে বর্তমানে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ওপর সরকারের সরাসরি প্রশাসনিক ও নীতিগত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হবে। এতে সরকারি সিদ্ধান্তের দ্রুত বাস্তবায়ন সহজ হবে বলে মনে করা হচ্ছে। অন্যদিকে বোর্ড কী বলে, না বলে, সেটার জন্যও অপেক্ষা করছি।’।
গত ১৭ সেপ্টেম্বর ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালকের কাছে এ সংক্রান্ত চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ে কর্মরত ধর্মীয় ব্যক্তিদের জন্য সম্মানি ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করা হয়। গত ৪ আগস্ট আয়োজিত সেলের সপ্তম সভায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে অধিদপ্তরে রূপান্তরের বিষয়ে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই কল্যাণমূলক প্রকল্পের আওতায় সারা দেশের মসজিদ, মন্দির, বৌদ্ধ বিহার ও গির্জায় নিয়োজিত ১০ লাখেরও বেশি ধর্মীয় সেবককে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা পাওয়ার পর ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রধান কার্যালয়, বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নতুন জনবল কাঠামোসহ প্রস্তাবিত অফিসের রূপরেখা তৈরির কাজ জোরকদমে চলছে। প্রয়োজনীয় চেকলিস্ট ও সকল আনুষঙ্গিক কাগজপত্রসহ পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাবটি দ্রুত ধর্ম মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। রূপান্তরটি চূড়ান্ত হলে স্বায়ত্তশাসিত কাঠামোর পরিবর্তে সরকারি অধিদপ্তরের প্রশাসনিক নিয়মাবলী প্রযোজ্য হবে।
বর্তমানে ইসলামিক ফাউন্ডেশন ‘ইসলামিক ফাউন্ডেশন আইন, ১৯৭৫’ অনুযায়ী গঠিত ও পরিচালিত একটি পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা। আইনের অধীনে এর নীতি নির্ধারণ, বাজেট তৈরি, বড় সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনার মূল ক্ষমতা রয়েছে বোর্ড অব গভর্নরসের ওপর। অধিদপ্তরে রূপান্তরিত হলে এ বিদ্যমান আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন আর বহাল থাকবে না। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, রূপান্তরের ক্ষেত্রে নতুন করে আইন পাসের দরকার হবে না, বরং প্রশাসনিক ও আইনি আদেশ জারির মাধ্যমে সহজেই ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে অন্যান্য সরকারি অধিদপ্তরের মতো কাঠামোগত রূপ দেওয়া সম্ভব। এখন সরকার আমাদের বাজেট দেয়, আবার নিজস্ব ইনকাম জেনারেটও করতে হয়। এতে কখনো কখনো ইসলামের মূলনীতি ও আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে।
ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংস্থা অধিশাখার যুগ্ম সচিব মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম জানান, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান থাকার কারণে বর্তমানে বেশ কিছু প্রশাসনিক জটিলতা ও বিলম্ব ঘটে থাকে। তিনি বলেন, স্বায়ত্তশাসিত অবস্থায় প্রতিটি সিদ্ধান্তের জন্য বোর্ড অব গভর্নরসের সভার ওপর নির্ভর করতে হয়। বর্তমানে বিভিন্ন সিদ্ধান্তের জন্য বোর্ডের সভা ও অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকতে হয়। দীর্ঘ দিন বোর্ডের সভা না হওয়ায় দৈনন্দিন প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমেও এক ধরণের জটিলতা তৈরি হয়েছে। অধিদপ্তরে রূপান্তরিত হলে সরাসরি মন্ত্রণালয়ের অধীনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নের গতি অনেকটাই বাড়বে।
সংস্থার মহাপরিচালক মুহাম্মদ মুহিববুল্লাহিল বাকী জানান, রূপান্তরের বিষযটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত। তিনি উল্লেখ করেন, বোর্ডের প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার পাশাপাশি অধিদপ্তরে রূপান্তরের রূপরেখা প্রস্তুতের কাজ সমান্তরালভাবে এগিয়ে চলছে। প্রস্তাবটি পুরোপুরি প্রস্তুত হওয়ার পর তা পর্যালোচনার জন্য বোর্ড অব গভর্নরসের সভায় উত্থাপন করা হবে। বোর্ড অব গভর্নরসের মতামত ও অনুমোদনের বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে। তবে এই প্রস্তাব নিয়ে বোর্ডের আগামী বৈঠক কবে অনুষ্ঠিত হবে, তা এখনো চূড়ান্ত বা নির্ধারিত হয়নি। আইনগত প্রক্রিয়ার বিষয়ে যুগ্ম সচিবের ভাষ্য, অধিদপ্তরে রূপান্তরের জন্য আলাদা কোনো আইন প্রণয়নের প্রয়োজন নেই।
বর্তমানে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা, আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন, নতুন বই প্রকাশ এবং বাৎসরিক বাজেট অনুমোদনের ক্ষেত্রে বোর্ডের অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। অনেক কর্মকর্তা মনে করেন, খাতা-কলমে স্বায়ত্তশাসন একটি ভালো প্রশাসনিক ব্যবস্থা হলেও বাংলাদেশের বাস্তবতায় স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলোও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সরকারি প্রভাবের মধ্যে থাকে। ফলে অধিদপ্তরে পরিণত হলে প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া আরও সুস্পষ্ট হবে।
অধিদপ্তরে রূপান্তরের ফলে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরি রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্তিকরণ এবং পূর্ণাঙ্গ পেনশনের সুযোগ নিশ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে সংস্থায় রাজস্ব ও উন্নয়ন খাত মিলিয়ে সরকারি পদের সংখ্যা ২,৩১১টি। এছাড়া বিভিন্ন প্রকল্প ও সম্মানী বা ভাতার ভিত্তিতে নিয়োজিত আছেন ৭১,১৮৫ জন কর্মী। সর্বমোট ৮৪,২৫৩ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী এই বিশাল সংস্থায় তাদের সেবা দিচ্ছেন। রূপান্তরের মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব খাতে জনবল বৃদ্ধির নতুন পথ সুগম হবে। ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, রাজস্ব ও উন্নয়ন খাতে ২ হাজার ৩১১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সম্মানী বা ভাতার ভিত্তিতে ৭১ হাজার ১৮৫ জন সহ সর্বমোট ৮৪ হাজার ২৫৩ জন কর্মরত রয়েছেন।
মহাপরিচালক মুহাম্মদ মুহিববুল্লাহিল বাকী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, রূপান্তর সম্পন্ন হলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আর্থিক ও চাকরির নিরাপত্তা বৃদ্ধি পাবে। রাজস্ব খাতের সুযোগ-সুবিধা বাড়লে কর্মদক্ষতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনা অনুযায়ী একদম উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মূল প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তার ঘটানো সম্ভব হবে।
উপজেলা পর্যায়ে অবকাঠামো এবং প্রশাসনিক জনবল পৌঁছানোর ক্ষেত্রে সরকারি এই সিদ্ধান্ত বড় ভূমিকা রাখবে। সরকারের লক্ষ্য সারা দেশের প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত ধর্মীয় শিক্ষা, সামাজিক সচেতনতা এবং ইমাম-মুয়াজ্জিনদের কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড ছড়িয়ে দেওয়া। প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক প্রধান জানান, নতুন খসড়া প্রস্তাবটি বোর্ডের সম্মতি লাভের পর চূড়ান্ত মঞ্জুরির জন্য ধর্ম মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অর্থ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। সকল আইনি ও প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেই আনুষ্ঠানিকভাবে অধিদপ্তর হিসেবে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নতুন যাত্রা শুরু হবে। তবে আমরা এটাকে অধিদপ্তর করার প্রক্রিয়াও শুরু করছি।