ফুটবল মাঠে খেলোয়াড়দের কীর্তি অমর করে রাখতে জার্সি তুলে রাখার নজির অনেক রয়েছে। তবে অকালপ্রয়াণে কোনো খেলোয়াড়ের ব্যবহৃত জার্সি চিরতরে অবসরে পাঠানোর ঘটনাগুলো বেশ আবেগঘন। এই তালিকার সর্বশেষ সংযোজন লিভারপুলের পর্তুগিজ ফরোয়ার্ড ডিয়েগো জোতা; তাঁকে স্মরণ করে লিভারপুল আজীবনের জন্য অবসরে পাঠিয়েছে তাঁর ব্যবহৃত ২০ নম্বর জার্সিটিকে। স্পেনের জামোরায় সড়ক দুর্ঘটনায় সহোদর আন্দ্রে সিলভা সমেত মৃত্যুবরণ করা ২৮ বছর বয়সী এই পর্তুগিজ ফরোয়ার্ডের স্মৃতি এখনো তরতাজা ফুটবলপ্রেমীদের মনে। লিভারপুলের খেলোয়াড় থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করা জোতার স্মরণে ক্লাবটির এ উদ্যোগ বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছে।
ইতালিয়ান ফরোয়ার্ড ফেদেরিকো পিসানি ১৯৯৭ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২২ বছর; জাতীয় দলের হয়েও অভিষেক হয়নি তাঁর। তাঁর মৃত্যুর পর ইতালিয়ান ক্লাব আটলান্টা বারগামাস্কা ক্যালসিও তাঁর ব্যবহৃত ১৪ নম্বর জার্সিটিকে পাঠিয়ে দিয়েছে অবসরে। একইভাবে রেমন্ড ব্যারি ব্যাঙ্কোট জোন্স, যিনি রে জোন্স নামেই পরিচিত ছিলেন, তাঁর মৃত্যু হয় জন্মশহর ইস্ট হ্যামে এক সড়ক দুর্ঘটনায়। ২০০৭ সালে ১৯তম জন্মদিনের মাত্র তিন দিন আগে মৃত্যুবরণ করা এই তরুণ নিজের মৃত্যুর মাত্র ২৩ দিন আগেই বাহন চালনার সনদ পেয়েছিলেন। কুইন্স পার্ক রেঞ্জার্সের হয়ে খেলা এই তরুণ তুর্কির মৃত্যুর পর ক্লাব কর্তৃপক্ষ তাঁর ব্যবহৃত ৩১ নম্বর জার্সিটি চিরতরে অবসরে পাঠিয়েছে।
বেলজিয়ান ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার জুনিয়র মালান্দা ব্রাসেলস, আন্ডারলেখট ও লিঁলের মতো দলের যুবদলে খেলার পর জার্মান ক্লাব ভলফসবার্গের মূল দলের হয়েও খেলেছিলেন। বেলজিয়ামের হয়ে যুব পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব করা এই ফুটবলার ২০ বছর বয়সে জার্মানিতে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। তাঁর মৃত্যু বেশ নাড়া দিয়েছিল সতীর্থ কেভিন ডি ব্রুইনাকে। মালান্দা চলে যাওয়ার পর তাঁর ব্যবহৃত ১৯ নম্বর জার্সিটিকে চিরদিনের জন্য অবসরে পাঠিয়ে দিয়েছে ভলফসবার্গ।
এমিলিয়ানো সালার অকালপ্রয়াণ বিশ্ববাসীকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। ২০১৮-১৯ মৌসুমের শীতকালীন দলবদলে ফরাসি ক্লাব নঁতে থেকে কার্ডিফ সিটিতে যোগদানের কথা ছিল তাঁর। আকাশপথে ইংল্যান্ডে যাওয়ার সময় মাঝআকাশে বিমান বিধ্বস্ত হয়ে সালা মৃত্যুবরণ করেন। যদিও তিনি আর্জেন্টিনার হয়ে যুব পর্যায়ে খেলেননি, তবুও ২৮ বছর বয়সে বিদায় নেওয়ার পর তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষী ছিল অজস্র। তাঁকে স্মরণ করে তাঁর ব্যবহৃত ৯ নম্বর জার্সিটিকে চিরতরে অবসরে পাঠিয়েছে নঁতে।
হোসে অ্যান্টোনিও রেয়েস ক্যাল্ডেরন ৩৫ বছর বয়সে স্পেনে এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। স্পেনের হয়ে ২০০৬ বিশ্বকাপ খেলা এই উইঙ্গার সেভিয়ার যুবদল থেকে উঠে এসেছিলেন। মৃত্যুর সময় রেয়েস খেলছিলেন স্প্যানিশ ক্লাব এক্সট্রেমাদুরার হয়ে। তাঁর স্মরণে ক্লাবটি তাঁর ব্যবহৃত ১৯ নম্বর জার্সিটিকে পাঠিয়েছে অবসরে। একই সঙ্গে লরি কানিংহামের কথা না বললেই নয়; রিয়াল মাদ্রিদে খেলা প্রথম ইংলিশ ফুটবলার কানিংহাম ১৯৮৯ সালে মাদ্রিদে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। তখন তিনি স্প্যানিশ ক্লাব রায়ো ভ্যাল্লেকানোর হয়ে খেলছিলেন এবং তাঁর বয়স হয়েছিল ৩৩ বছর।
ফুটবলারদের অধিকাংশ সড়ক দুর্ঘটনাই ঘটেছে স্পেনে, যা হয়তো নিছক কাকতালীয়। তবে এ আলাপে মুখ্য বিষয় তা নয়। এখানে মুখ্য আলাপ হলো দলগুলো তাদের খেলোয়াড়দের সম্মানিত করার সৌন্দর্যটা। অকালপ্রয়াণে জার্সিকে অবসরে পাঠানোর এই সংস্কৃতি ফুটবলকে আরও মানবিক করে তোলে। ফুটবলটা আসলেই ভদ্রলোকেরই খেলা, যেখানে মাঠের লড়াইয়ের বাইরেও খেলোয়াড়দের প্রতি ক্লাবের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার প্রতিফলন ঘটে এভাবেই।
২০ বছর বয়সে জার্মানিতে সড়ক দুর্ঘটনা কেড়ে নেয় তাঁর প্রাণ।
বেলজিয়ান তারকা ডিফেন্ডার কেভিন ডি ব্রুইনারের সঙ্গে তাঁর ছিল ভীষণ বন্ধুত্ব।
সঙ্গে ছিলেন তাঁর দুইজন কাজিন; যাঁদের মধ্যে একজন বেঁচে গিয়েছিলেন সৌভাগ্যক্রমে।
এ ছাড়া ধারে খেলেছিলেন রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে, খেলেছিলেন আর্সেনাল এবং অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের হয়ে।
সেভিয়ার যুবদল থেকে উঠে আসা এই উইঙ্গার সেভিয়ার হয়ে জিতেছিলেন উয়েফা ইউরোপা লিগ শিরোপাও।
একটুখানি কাকতাল শেষপাতে একটি কাকতালীয় বিষয় নিয়ে বলা যাক।
মুক্তিযুদ্ধ ও গবেষণা সম্পাদক, চট্টগ্রাম বন্ধুসভা