শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৩৮ অপরাহ্ন

আইএমএফের সঙ্গে ৪৫০ কোটি ডলারের নতুন ঋণ আলোচনা

প্রতিবেদকের নাম

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বর্তমান ঋণ কর্মসূচির মেয়াদ ও শর্তাবলি নিয়ে নতুন করে ভাবছে বাংলাদেশ সরকার। সংস্থাটির কাছ থেকে তিন বছর মেয়াদে নতুন করে ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ সহায়তা পাওয়ার লক্ষ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। নতুন এই কর্মসূচিতে ব্যাংকিং ও রাজস্ব খাতের প্রয়োজনীয় সংস্কার, করছাড়ের হার যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা এবং সরকারি ভর্তুকি নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকার আশা করছে, সকল পক্ষ একমত হলে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই নতুন ঋণ চুক্তি সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। তাঁর মতে, নতুন ঋণ নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নেও সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আইএমএফও নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছিল। জাতীয় রাজস্ব আদায় বাড়াতে প্রতি বছর মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অতিরিক্ত শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশের সমপরিমাণ রাজস্ব সংগ্রহের শর্তও ছিল।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত কর্মসূচির শর্তসমূহ চূড়ান্ত করতে উভয় পক্ষের মধ্যে আলোচনা চলমান রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনার জন্য থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অনুষ্ঠেয় আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদল সভায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিষয়গুলো তুলে ধরবেন। মন্ত্রণালয়ের প্রত্যাশা, এই বৈঠকের মাধ্যমে নতুন ঋণ কর্মসূচির ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতি অর্জিত হবে।

নতুন ঋণ নিয়ে আলোচনার প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি আইএমএফ বাংলাদেশকে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ সহায়তা অনুমোদন করেছিল, যা ২০২২ সালের জুলাইয়ে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আবেদনের ভিত্তিতে করা হয়। সেই কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ ইতিমধ্যে পাঁচ কিস্তিতে ৩৬৪ কোটি ডলার পেয়েছে। পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের জুন মাসে সেই কর্মসূচির আকার বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত করা হয়। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে পুরোনো কর্মসূচির শর্ত পালন কঠিন হয়ে পড়ায় সরকার নতুন কর্মসূচির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। গত এপ্রিল মাসে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন সভায় এ বিষয়টি জানানো হয় এবং গত ৩ জুন বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন ঋণের জন্য চিঠি দেয়।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আগের কর্মসূচির অনেক শর্তই নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়িত হয়নি। তিনি মনে করেন, নতুন কর্মসূচিতেও হয়তো একই ধরনের শর্ত যুক্ত হতে পারে। জাহিদ হোসেন আরও বলেন, জাতীয় রাজস্ব আদায়ে প্রত্যাশিত গতি না থাকায় সরকারি ব্যয় মেটাতে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণের ওপর চাপ বাড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজস্ব ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা আনা অপরিহার্য। তিনি জোর দিয়ে বলেন, আইএমএফের সংস্কার কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়ন করা জাতীয় স্বার্থেই প্রয়োজন এবং সংস্থাটির বাধ্যবাধকতা সংস্কার কাজে গতি আনতে সহায়তা করতে পারে।

নতুন ঋণ কর্মসূচির আলোচনায় বিনিময় হারকে বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া, রাজস্বনীতি ও কর আদায় কার্যক্রম পৃথকীকরণ, দেউলিয়া আইন প্রণয়ন এবং সরকারি ভর্তুকি নিয়ন্ত্রণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। উল্লেখ্য, ২০২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে বিভিন্ন করছাড় যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার পূর্বপরিকল্পনা থাকলেও তাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি। এছাড়া এনবিআরের কাঠামো পুনর্গঠন এবং রাজস্বনীতি ও কর আদায়ের দায়িত্ব আলাদা করার লক্ষ্যমাত্রা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে পূরণ করার কথা ছিল, যা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। এসব ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

রাজস্ব সংস্কার সংক্রান্ত কার্যক্রম পর্যালোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। বর্তমান সরকার আগের নেওয়া অনেক সংস্কার কার্যক্রম থেকে সরে না এসে বরং বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধাপে ধাপে এগিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে। ব্যাংকিং খাতে ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন প্রণয়ন ও ব্যাংক একীভূতকরণের মতো কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হলেও ভর্তুকি হ্রাসে আশানুরূপ অগ্রগতি হয়নি, বরং সামগ্রিক ভর্তুকির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

আগামী নভেম্বর মাসে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদলের ঢাকা সফরের কথা রয়েছে, যেখানে সংস্কার পরিকল্পনা ও ঋণের শর্তাবলি নিয়ে আরও নিবিড় আলোচনা হবে। মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন কর্মসূচি নিয়ে নিয়মিত যোগাযোগ চলছে এবং সামনে আরও বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। নতুন কর্মসূচির চূড়ান্ত রূপ মূলত দুই পক্ষের সমঝোতা এবং সংস্কার বাস্তবায়নের বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার ওপর নির্ভর করছে। এই চুক্তি সম্পন্ন হলে দেশের বৈদেশিক অর্থায়নের পথ যেমন সুগম হবে, তেমনি ব্যাংকিং ও রাজস্ব খাতে কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য বাড়তি চাপ ও দায়বদ্ধতা তৈরি হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


আমাদের ফেসবুক পেইজ