শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:০৩ অপরাহ্ন

ইরানকে ঘিরে ক্ষেপণাস্ত্র কারখানা বাড়াচ্ছে সৌদি আরব

প্রতিবেদকের নাম

সৌদি আরব তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কারখানা উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারণ করছে বলে নতুন তথ্য পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, আরও বড় আকারের কঠিন জ্বালানিচালিত ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির লক্ষ্য নিয়েই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা আগের তুলনায় অনেক বেশি দূরত্বে লক্ষ্যভেদ করতে সক্ষম হবে এবং ভারী বিস্ফোরক বহনেও সক্ষম হবে। স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া দীর্ঘ এক বছরের ছবি বিশ্লেষণের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের দুই গবেষক এই মূল্যায়ন করেছেন। এটি সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ইরান থেকে আসা সম্ভাব্য হুমকি প্রতিরোধে রিয়াদের অবস্থানকে শক্তিশালী করবে বলে মনে করা হচ্ছে। শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্রে বদলে যেতে পারে সামরিক ভারসাম্য। এই সক্ষমতার কারণে তেহরান সামরিক সুবিধা পেয়ে থাকে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্যাটেলাইট প্রতিষ্ঠান প্ল্যানেট ল্যাবস ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রিয়াদের প্রায় ২০০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত আল-দুওয়াদিমি ক্ষেপণাস্ত্র কমপ্লেক্সের বিভিন্ন ছবি ধারণ করেছে।

এসব ছবি বিশ্লেষণ করেছেন ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এফপিআরআই) গবেষক স্যাম লেয়ার ও মাইকেল ডুইটসম্যান।

তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কমপ্লেক্সটিতে নতুন একটি ভবন নির্মিত হয়েছে, যেখানে ক্ষেপণাস্ত্রের কঠিন জ্বালানি তৈরির বিশেষ গভীর গর্ত বা কাস্টিং পিট স্থাপন করা হচ্ছে। এই ধরনের অবকাঠামো বড় ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির প্রস্তুতির ইঙ্গিত দেয়। তাদের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, স্যাটেলাইটের ছবিগুলো ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনকেন্দ্রের অবকাঠামো সম্প্রসারণের ইঙ্গিত দেয়। সিএনের বিশ্লেষক ডেকার ইভেলেথও আল-দুওয়াদিমির নির্মাণকাজ বাণিজ্যিক স্যাটেলাইটের ছবি দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছেন।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, কমপ্লেক্সটিতে আরেকটি ভবন তৈরি করা হয়েছে, যা ক্ষেপণাস্ত্রের যন্ত্রাংশ বা জ্বালানির উপকরণ সংরক্ষণের কাজে ব্যবহৃত হতে পারে। নতুন ভবনটির দুই পাশে সুরক্ষামূলক দেয়ালও দেখা গেছে, যা মূলত দুর্ঘটনাজনিত বিস্ফোরণ থেকে অন্য স্থাপনাকে বাঁচানোর জন্য তৈরি করা হয়। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে রয়টার্সের পক্ষ থেকে সৌদি দূতাবাস ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগ করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তেহরান-সমর্থিত হুতি যোদ্ধাদের সঙ্গে ইয়েমেনকেন্দ্রিক প্রাণঘাতী সংঘাতেও সৌদি আরবের অবস্থান শক্তিশালী হতে পারে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এসব গর্তে জ্বালানির বিভিন্ন উপাদানের মিশ্রণ ক্ষেপণাস্ত্রের মোটরের আবরণের মধ্যে ঢেলে শক্ত করা হয়। এর দুই পাশে এমন কিছু দেয়ালও দেখা গেছে, যেগুলো দুর্ঘটনাজনিত বিস্ফোরণের অভিঘাত আশপাশের স্থাপনা থেকে সরিয়ে দিতে নির্মাণ করা হয়ে থাকতে পারে। এর উদ্দেশ্য হতে পারে আরও বড় ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি, যেগুলো অধিক ভার বহন করতে বা আরও দূরে আঘাত হানতে পারবে। আর আল-দুওয়াদিমি কমপ্লেক্স সম্প্রসারণের উদ্দেশ্য হতে পারে আরও দূরপাল্লার ডিএফ-২১ অথবা একই ধরনের অন্য কোনো ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি।

গবেষকদের মতে, আল-দুওয়াদিমি কমপ্লেক্সে চীনা প্রযুক্তি ব্যবহৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ১৯৮৭ সালে চীন থেকে সৌদি গোপনে প্রায় ৪০টি তরল জ্বালানিচালিত ডিএফ-৩ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সংগ্রহ করেছিল, যার তথ্য ১৯৯১ সালে সিআইএর নথিতে উঠে আসে। পরবর্তীতে ২০১৪ সালের এপ্রিলে সামরিক কুচকাওয়াজে সৌদি এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো প্রদর্শন করে। সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনে ব্যবহৃত চীনা নকশার ডিএফ-১৫ ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষের ছবি ও ভিডিও থেকেও ধারণা পাওয়া যায় যে, রিয়াদ কঠিন জ্বালানিচালিত প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে। ওই চুক্তির আওতায় সৌদি আরবকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে সহায়তা দেয়ার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। ১৯৯১ সালে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) একটি অবমুক্ত মূল্যায়নে এ তথ্য উঠে আসে।

ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টুডিসের সাশা ব্রুখম্যানের মতে, দূরপাল্লার এই ক্ষেপণাস্ত্র সৌদির সামরিক সক্ষমতায় নতুন মাত্রা যোগ করবে। এর ফলে ইরান ও তার প্রক্সি বাহিনীর ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে মার্কিন এফ-১৫ যুদ্ধবিমানের ওপর রিয়াদের নির্ভরতা কিছুটা কমবে। একই সাথে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির এই নতুন প্রতিযোগিতা তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোর কর্মকাণ্ডেও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একই সঙ্গে নিজস্ব প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। এর ফলে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ঝুঁকি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা এফ-১৫ যুদ্ধবিমান পাঠানোর ওপর নির্ভরতা কমতে পারে। এফপিআরআইয়ের মূল্যায়নের সঙ্গে একমত পোষণ করে তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশ এখন আক্রমণাত্মক ও প্রতিরক্ষামূলক সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

আল-দুওয়াদিমি কমপ্লেক্সের নির্মাণকাজের অগ্রগতি সম্পর্কে গবেষকরা জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বরের স্যাটেলাইট ছবিতে ভবনটির ভেতরে দুটি গভীর গর্ত দেখা গিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ২০২৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বরের ছবিতে দেখা গেছে, ভবনটির ছাদের কিছু অংশ এখনো অসম্পূর্ণ রয়েছে, যা চলমান কাজের প্রমাণ।

এই ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কেবল সামরিক ক্ষেত্রেই নয়, বরং মার্কিন-সৌদি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে সৌদি আরবের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের যে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে, তার ওপর এর নেতিবাচক রাজনৈতিক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সমালোচকদের ভয়, যথাযথ নজরদারির অভাবে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সৌদি ভবিষ্যতে গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। যদিও সৌদি আরব সবসময়ই এমন অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে এসেছে।

ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি রপ্তানিতে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে রেখেছে, আর গবেষকদের মতে সেই কারণেই সৌদি আরব বেইজিংয়ের দিকে ঝুঁকেছে। সিআইএ এবং হোয়াইট হাউসের কাছে এ বিষয়ে মন্তব্য চাওয়া হলেও কোনো পক্ষই সাড়া দেয়নি। সবমিলিয়ে, আল-দুওয়াদিমির এই সম্প্রসারণ মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যে এক নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


আমাদের ফেসবুক পেইজ