লক্ষ্মীপুরে সরকারি অবকাঠামো উন্নয়নের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের প্রধানকে ঘিরে গত এক মাসে প্রশাসনিক রদবদলের হিড়িক পড়েছে। ঘুষ গ্রহণ, টেন্ডারবাজি, অনিয়ম এবং দুর্নীতির মতো গুরুতর অভিযোগের জেরে কাউকে সাময়িক বরখাস্ত, কাউকে স্ট্যান্ড রিলিজ আবার কাউকে বদলি করা হয়েছে। ধারাবাহিকভাবে এসব দপ্তরের প্রধানদের সরিয়ে দেওয়ার ফলে উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে প্রশাসনিক শূন্যতা ও স্থবিরতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে কর্মকর্তাদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া ইতিবাচক। তবে তারা প্রশ্ন তুলেছেন, বদলি বা সাময়িক বরখাস্তই কি যথাযথ শাস্তি? প্রচলিত ফৌজদারি আইন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইন এবং সরকারি চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী, দুর্নীতির দায়ে বিভাগীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে বদলি করেই দায়িত্ব শেষ করা হয়, যা দুর্নীতি প্রতিরোধের মূল লক্ষ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তবে শুধু বদলি বা সাময়িক বরখাস্তের মধ্যেই ব্যবস্থা সীমাবদ্ধ থাকলে দুর্নীতির প্রকৃত বিচার নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। এতে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে—মূল অপরাধের বিচার করবে কে। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাটি ঘটেছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নুরুল আমিনকে ঘিরে। বকেয়া বিল ও মালামালের ফাইল অনুমোদনের বিনিময়ে ঘুষ দাবির একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ভিডিওতে তাঁকে ‘২ কোটি টাকার নিচে নেবো না’ বলতে শোনা যায়। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৮ সেপ্টেম্বর তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখতে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এদিকে লক্ষ্মীপুর পৌরসভার সড়ক সংস্কার ও ড্রেন নির্মাণে ৭ কোটি ৩৭ লাখ টাকা ব্যয়ে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি দুদকের নজরে এলে তারা পৌরসভার তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জুলফিকার হোসেনকে তলব করে। দুদকের এই পদক্ষেপের পরপরই তাঁকে জরুরি ভিত্তিতে খাগড়াছড়িতে বদলি করা হয়।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের বিদায়ী নির্বাহী প্রকৌশলী বিলকিস আক্তারের বিরুদ্ধেও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। তাঁর বিরুদ্ধে ৯ হাজার ৩৮৯টি টুইন পিট ল্যাট্রিন বিতরণ এবং ৫৬ কোটি টাকার ওয়াশ প্রকল্পের ব্যাপক অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৮ থেকে ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ওয়াশব্লক নির্মাণের ক্ষেত্রেও তিনি অনিয়ম ও তদারকিতে অবহেলার পরিচয় দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এর আগেও গাজীপুরে দায়িত্ব পালনকালে একই ধরনের অভিযোগ ছিল তাঁর বিরুদ্ধে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডেও পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডে এক সপ্তাহেই পরিবর্তন।
মেঘনা উপকূলীয় কমলনগর ও রামগতি উপজেলায় ৩ হাজার ১০০ কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের কাজের গতি ও মান নিয়ে অসন্তোষ ছিল। কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হওয়ায় নির্বাহী প্রকৌশলী নাহিদ উজ্জামান খানকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর নতুন নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে মো. আনিস হায়দার খান যোগ দিলেও, দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র এক সপ্তাহের মাথায় তাঁকেও সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। বর্তমানে সেখানে মো. নুরুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সর্বশেষ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) নির্বাহী প্রকৌশলী শ্রাবণী চক্রবর্ত্তী অনিয়মের অভিযোগে আলোচনায় আসেন। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণ ও সংস্কারকাজে সরকারি নীতিমালা উপেক্ষা করে তিনি পছন্দের ঠিকাদারদের মধ্যে ‘সিলড কোটেশন’ বা এসএলডির মাধ্যমে কাজ ভাগ করে দিয়েছেন। ঠিকাদারদের প্রতিবাদ ও প্রশাসনিক জটিলতায় শেষ পর্যন্ত তাঁকেও বদলি করা হয়।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর লক্ষ্মীপুর শাখার সভাপতি মো. কামাল হোসেনসহ স্থানীয় প্রতিনিধিরা মনে করেন, কেবল বদলি বা সাময়িক বরখাস্ত করাই যথেষ্ট নয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আমলে সম্পন্ন হওয়া প্রতিটি প্রকল্পের নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ অডিট করার দাবি জানিয়েছেন তারা। তাঁদের মতে, অনিয়মে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা না নিলে দুর্নীতি রোধ করা সম্ভব হবে না।