ভারতের উত্তর প্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনের প্রস্তুতি ও রণকৌশল নির্ধারণে লক্ষ্ণৌ সফর করেছেন দেশটির কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। আগামী বছরের শুরুতেই রাজ্যটিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সেখানে আড়াই হাজার দলীয় নেতার এক সম্মেলনে অমিত শাহ বিজেপি নেতাদের অভ্যন্তরীণ মান-অভিমান, হতাশা ও অসন্তোষ ভুলে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান। তিনি নেতাদের উদ্দে্যে বলেন, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির নানা ক্ষোভ গোমতী নদীতে বিসর্জন দিয়ে দলকে জয়ী করতে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। কিন্তু দলের স্বার্থে এখান থেকে বেরোনোর পর তা গোমতীর জলে বিসর্জন দিন।
সম্মেলনে অমিত শাহ উল্লেখ করেন, সবার সব আকাঙ্ক্ষা মেটানো সম্ভব হয় না। এতে অনেকের মনে কষ্ট ও হতাশার সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক হলেও দলীয় স্বার্থ রক্ষায় তা ভুলে যাওয়াই এখনকার প্রধান দায়িত্ব। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কোনো একক নেতার পক্ষে একাই সবাইকে জয়ী করা অসম্ভব; মূলত মাঠপর্যায়ের কর্মীদের পরিশ্রমের ওপরই চূড়ান্ত বিজয় নির্ভর করে। উত্তর প্রদেশ ও মহারাষ্ট্রে দলীয় কোন্দল এবং শরিকি অসন্তোষ মেটাতে তিনি এই প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছেন।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিধান পরিষদের নির্বাচনে বিজেপির অপ্রত্যাশিত ফলাফলের পরই কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের মধ্যে দুশ্চিন্তা দেখা দেয়। এই নির্বাচনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নিজস্ব আসন বারানসির দুটি আসনেই হেরে যায় বিজেপি। কেবল বারানসিই নয়, এলাহাবাদ, লক্ষ্ণৌ ও আগ্রাসহ মোট পাঁচটি আসনে জয় লাভ করে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল সমাজবাদী পার্টি (এসপি)। মূলত স্নাতক ও শিক্ষকেরা এই নির্বাচনের ভোটার ছিলেন। ফলে শিক্ষিত সমাজ বিজেপি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন কি না, তা নিয়ে বিজেপির ভেতরে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ভোটচুরির বিরুদ্ধে দেশজুড়ে যুবকদের চলমান আন্দোলনের প্রভাবেই এই ফল এসেছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। বিধানসভার ভোটের আগে এসপির এই ৫ আসনে জয় বিজেপির দুশ্চিন্তার কারণ হয়েছে এই জন্য যে এবারের ভোটাররা ছিলেন শুধু শিক্ষক ও স্নাতকেরা। অর্থাৎ ওই ৫ আসনের শিক্ষিত ভোটাররা বিজেপিকে ত্যাগ করেছেন।
সম্প্রতি উত্তর প্রদেশের ১১টি রাজ্যসভা আসনে নির্বাচনে বিজেপি পুরোনোদের বাদ দিয়ে নতুনদের মনোনয়ন দেয়। দলটি ৮টি আসনে জয় পেলেও এই সিদ্ধান্তের কারণে দলীয় কর্মীদের ভেতরে অসন্তোষ দেখা দেয়, যা পরবর্তী বিধান পরিষদ নির্বাচনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর জবাবে অমিত শাহ দলীয় নেতাদের বার্তা দিয়ে বলেন, টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে হলে ভেদাভেদ ভুলে দলকে জেতাতে হবে। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, উত্তর প্রদেশ ছাড়াও দেশের এনডিএশাসিত ২১টি রাজ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (ইউসিসি) প্রণয়ন করা হবে এবং ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগেই তা বাস্তবায়ন সম্পন্ন হবে। সেই আসনগুলোর প্রত্যেকটিতেই বিজেপি পুরোনোদের বাতিল করে নতুন প্রার্থী দেয়। ২০২৯ সালের লোকসভা ভোটের আগে সেটা হয়ে যাবে।
এর আগে দেশের প্রথম রাজ্য হিসেবে উত্তরাখন্ডে ইউসিসি কার্যকর করা হয়। পরবর্তীতে গুজরাট, আসাম ও মধ্য প্রদেশ বিধানসভায় এই বিল পাস হয়েছে। এছাড়া পশ্চিমবঙ্গ, ছত্তিশগড়, মহারাষ্ট্র ও রাজস্থানে ইউসিসি চালুর প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। ২০১৭ সালে উত্তর প্রদেশে ক্ষমতাসীন হলেও বিজেপি তখন এই পদে হাঁটেনি, তবে এবার বিধানসভা ভোটের আগে এই বিষয়ে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলো। দলীয় নেতাদের একাত্ম করার পাশাপাশি হিন্দুত্ববাদী মেরুকরণ জোরদার করতেই শাহ ইউসিসির প্রতিশ্রুতি সামনে এনেছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
সম্মেলনে বিরোধী দল সমাজবাদী পার্টির তীব্র সমালোচনা করে অমিত শাহ বলেন, আগামী ৩০ বছরেও উত্তর প্রদেশে এসপি ক্ষমতায় আসতে পারবে না এবং জনগণ তাদের তৃতীয় প্রজন্মকেও ক্ষমা করবে না। এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় এসপি প্রধান অখিলেশ যাদব প্রশ্ন তোলেন, ১০ বছর কেন্দ্রে ও রাজ্যে ক্ষমতায় থেকেও কেন বিজেপি ইউসিসি কার্যকর করতে পারেনি? কেবল ফাঁকা বক্তৃতা দিয়ে নির্বাচনে জয়ী হওয়া যায় না বলে তিনি মন্তব্য করেন এবং বিধান পরিষদ নির্বাচনের ফলই তার প্রমাণ বলে দাবি জানান। স্রেফ বক্তৃতা করে ভোটে জেতা যায় না।
বিজেপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের পাশাপাশি শরিক দলগুলোর অসন্তোষও চরম আকার ধারণ করেছে। উত্তর প্রদেশে বিজেপির প্রধান তিন শরিক দল হলো নিষাদ পার্টি, সুহেলদেব ভারতীয় সমাজ পার্টি ও রাষ্ট্রীয় লোকদল। গত নির্বাচনে নিষাদ পার্টি ১১টি এবং সুহেলদেব ভারতীয় সমাজ পার্টি ৬টি আসনে জয়ী হয়েছিল। তবে সম্প্রতি দিল্লিতে অনুষ্ঠিত এক সমাবেশে নিষাদ পার্টির প্রধান সঞ্জয় নিষাদ চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে সতর্ক করেন, বর্তমান পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে তাঁরা বিকল্প রাজনৈতিক পথ বেছে নিতে বাধ্য হবেন। অন্যদিকে ওমপ্রকাশ রাজভরের নেতৃত্বাধীন সুহেলদেব ভারতীয় সমাজ পার্টিতেও বিদ্রোহ দেখা দিয়েছে এবং অনেক নেতাকর্মী দল ছেড়ে অখিলেশের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন। নিষাদ পার্টি জেতে ১১ আসনে, সুহেলদেব ভারতীয় সমাজ পার্টি পেয়েছিল ৬টি আসন। অখিলেশের প্রতি দলের অনেকেই ঝুঁকতে চাইছেন।
অপর শরিক রাষ্ট্রীয় লোকদলের (আরএলডি) প্রধান জয়ন্ত চৌধুরী ২০২২ সালের নির্বাচনে অখিলেশ যাদবের সঙ্গে জোট বেঁধে ৮টি আসন পেয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি এনডিএ জোটে যোগ দিয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হন। পশ্চিম উত্তর প্রদেশের জাট সম্প্রদায়ের মধ্যে এই দলের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। আগামী বিধানসভা নির্বাচনে জয়ন্ত চৌধুরী কী ভূমিকা নেবেন, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। ফলে নির্বাচনের আগে রাজ্যটির রাজনৈতিক জোটে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই সমস্ত জটিল সমীকরণ দূর করা ও বিধান পরিষদের বিপর্যয়ের কারণ খুঁজে বের করতেই অমিত শাহ লক্ষ্ণৌ সফর করছেন।