চলতি বছরের অক্টোবরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি পর্যালোচনায় স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ডিসেম্বর মাসের আগে ডেঙ্গুর প্রকোপ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। ফলে ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত অক্টোবরে ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ডেঙ্গু আক্রান্ত তিন বোনই হাসপাতালে ছিল, একজনের ফেরা হলো না। ডিসেম্বরের আগে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতির সম্ভাবনা কম। উপকূলে ডেঙ্গুর বিস্তার, কেন এত সংক্রমণ।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, চলতি বছরের ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মোট ৪১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এ বছর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি রোগী। এর মধ্যে শুধু অক্টোবরেই মারা গেছেন ১৭৩ জন, যেখানে সেপ্টেম্বরে এ সংখ্যা ছিল ১৪৮। স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর ডেঙ্গুর পাশাপাশি হামের প্রাদুর্ভাবও বড় চাপ সৃষ্টি করেছে, যেখানে ইতিমধ্যে ১ হাজার ২০০ জনের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এদিকে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাবও মোকাবিলা করছে। সেখানে এক দিনেই নতুন করে ৬৭ রোগী ভর্তি হন।
চিকিৎসকেরা পর্যবেক্ষণ করে দেখেছেন, অনেক রোগীই শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি হওয়ার পর হাসপাতালে আসছেন। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালক মির্জা গোলাম সারওয়ার জানান, কেবল তাঁদের হাসপাতালেই ২৭৯ জন রোগী চিকিৎসাধীন এবং প্রতিদিন নতুন রোগী ভর্তির সংখ্যা বাড়ছে। তিনি জানান, অনেক রোগী শক অবস্থায় আসছেন, যেখানে রক্তচাপ ও অক্সিজেনের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে কম থাকে। তাঁদের রক্তচাপ কখনো কখনো এতটাই কমে যাচ্ছে যে, তা মাপা যাচ্ছে না।
ফয়সাল ফেরদৌস নামে ঢাকার এক বাসিন্দা, যিনি ২০১৭ ও ২০২৪ সালেও আক্রান্ত হয়েছিলেন, চলতি মাসের শুরুতে আবারও ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। তিনি জানান, বারবার আক্রান্ত হওয়া শারীরিক ও মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার মতো অনেকেই এখন একই উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। ‘পুতুলের মতো মেয়েটা আমাদের ছেড়ে চলে গেল’। এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, ‘যাঁরা আগে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছিলেন, তাঁরা আবার আক্রান্ত হলে গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকিতে বেশি থাকতে পারেন।’। সেখান থেকে ফেরার কিছুদিন পরই তিনি ও তাঁর স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশারের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টি ও আর্দ্রতার ধরনে যে পরিবর্তন এসেছে, তাতে মশার প্রজনন মৌসুম দীর্ঘ হচ্ছে। কবিরুল বাশার আরও বলেন, কিছুটা স্বস্তি মিলতে পারে। ফলে এডিস মশা আরও দীর্ঘ সময় সক্রিয় থাকছে।
তিনি বলেন, অক্টোবর মাসে মৃত্যু যে হারে বেড়েছে, তা হয়তো অব্যাহত থাকবে না, তবে নভেম্বর মাস জুড়ে সংক্রমণ থেকে যাবে।
আগের বৃষ্টির কারণে তৈরি হওয়া প্রজননস্থল থেকে মশার বংশবিস্তার চলতেই থাকবে, তাই আবহাওয়া শুষ্ক হলেও সংক্রমণের হার খুব একটা কমবে না।
বর্তমানে বাংলাদেশে ডেঙ্গুর টিকা এখনো চালু হয়নি, যদিও কর্তৃপক্ষ দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষার অংশ হিসেবে বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনা করছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে মশা নিধনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত সচেতনতা ও দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণই এখন প্রধান উপায় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।