রাজনৈতিক মতাদর্শ কিংবা শেকড়ের টান—যেটিই বড় হোক না কেন, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত সব অভিবাসীর জন্য স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ এখন সময়ের দাবি। যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনে বামমুখী হাওয়া।
যেসব বাংলাদেশি ভোটার হিসেবে যোগ্য, তাদের প্রত্যেকেরই উচিত নভেম্বরের নির্বাচনে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে ভোটার হিসেবে নিবন্ধন করা এবং পছন্দের প্রার্থীদের সমর্থন দেওয়া। যাঁরা ভোট দেওয়ার যোগ্য, তাঁদের সবার উচিত ভোটার হিসেবে নিবন্ধন করা এবং এ বছরের নভেম্বর মাসে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীদের সমর্থনে ভোট দেওয়া।
উন্নত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দেশ হিসেবে আমেরিকা আমাদের যে অবাধ ভোটাধিকার দিয়েছে, অনেক দেশেই তা কেবলই একটি অলীক স্বপ্ন। এমনকি নিজের জন্মভূমি বাংলাদেশেও সর্বজনীন ভোটাধিকার প্রয়োগে অনেককে নানাবিধ সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। আমেরিকার মতো সুযোগপূর্ণ দেশে এসেও আমরা অনেক সময় এই অমূল্য নাগরিক অধিকারের গুরুত্ব অনুধাবন করতে ব্যর্থ হই। বিষয়টি অত্যন্ত পরিহাসের যে আমরা অনেক সময় এই সুযোগের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হই এবং আমেরিকায় আমাদের প্রয়োগযোগ্য এই অমূল্য অধিকারের যথাযথ মূল্য দিতে ভুলে যাই।
বাঙালি হিসেবে রাজনীতি ও নির্বাচনী উত্তাপ যেন আমাদের রক্তে মিশে আছে। প্রবাসে থেকেও আমরা দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর শাখা খুলে গভীর অনুরাগ ও সম্পৃক্ততা বজায় রাখি। যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে বাংলাদেশের প্রধান প্রায় সব রাজনৈতিক দলেরই অস্তিত্ব রয়েছে। দেশের বিভিন্ন সমসাময়িক ইস্যু নিয়ে প্রবাসীরা যেভাবে সোচ্চার ও সরব, তাদের সেই রাজনৈতিক সচেতনতাকে অবশ্যই সম্মান জানাই। তবে আমার পরামর্শ হলো, নিজস্ব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আমেরিকার জাতীয় স্বার্থ ও দৃষ্টিভঙ্গির কাঠামোর ভেতর থেকেই বিশ্লেষণ করা জরুরি। বিশ্বের মোড়ল হিসেবে আমেরিকা দক্ষিণ এশিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলে নিজস্ব প্রভাব বিস্তার করে রাখে, আর আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশের সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এসব দলের সমর্থকেরা কখনো কখনো বাংলাদেশের বিভিন্ন ইস্যুকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েন।
আমরা যদি কেবল জন্মভূমির রাজনৈতিক নেতাদের নাম নিয়ে অনলাইন বা অফলাইনে একে অপরের সঙ্গে বিবাদে লিপ্ত থাকি, তবে তাতে কোনো কার্যকর ফল আসবে না। এর বদলে রিপাবলিকান, ডেমোক্র্যাট কিংবা স্বতন্ত্র ভোটার হিসেবে মূলধারার রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন। আমেরিকার ইতিহাস অভিবাসীদের ইতিহাস। বিশেষ করে নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্য তো অভিবাসীদের মিলনমেলা। এলিস আইল্যান্ডের মতো ঐতিহাসিক প্রবেশদ্বার দিয়ে লাখ লাখ অভিবাসী এই দেশে পা রেখেছেন। নিউ ইয়র্কসহ পুরো যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা এখন অভিবাসী সম্প্রদায়ের গুরুত্ব সম্পর্কে সম্যক অবগত। বাংলাদেশ ও ভেনেজুয়েলার মতো দেশগুলোর রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা রয়েছে—এটি কোনো গোপন বিষয় নয়।
নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশিদের বিপুল উপস্থিতি আমাদের জন্য একটি বড় শক্তি। এই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে অঙ্গরাজ্য ও জাতীয় পর্যায়ে রাজনীতির মোড় ঘোরানো সম্ভব। তাই যোগ্য প্রত্যেক বাংলাদেশি ভোটারের প্রতি আহ্বান জানাই, আপনারা ভোটার হিসেবে দ্রুত নিবন্ধন করুন। নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, যেকোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হিসেবে অথবা স্বতন্ত্র ভোটার হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়া সম্ভব। শুধু ভোট দেওয়াই নয়, রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর সভা-সমাবেশে অংশ নেওয়া, মতামত জোরালোভাবে উপস্থাপন করা এবং প্রয়োজনে সরকারি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মানসিকতাও গড়ে তুলতে হবে।
আমেরিকার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আমাদের এই সক্রিয় সম্পৃক্ততা শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ এবং বাংলাদেশি আমেরিকান সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে ভারসাম্য সৃষ্টি করবে। ড. দিলওয়ার আরিফ, যিনি নিউ ইয়র্কের বাফেলোতে অবস্থিত ক্যানিসিয়াস ইউনিভার্সিটির মাল্টিমিডিয়া জার্নালিজমের সহযোগী অধ্যাপক এবং জার্নালিজমের পরিচালক, মনে করেন যে এভাবেই প্রবাসে আমাদের অবস্থান আরও সুসংহত হবে।