রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৪৮ পূর্বাহ্ন

দারিদ্র্য বিমোচনে ইসলামের নির্দেশনা ও করণীয়

প্রতিবেদকের নাম

ইসলাম মানবজীবনের প্রতিটি সমস্যার সমাধান দিয়ে থাকে। জীবনের প্রতিকূলতা মোকাবিলায় ইসলামের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ অপরিহার্য। পবিত্র কোরআনের সূরা বাকারার ২০৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, ‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা পরিপূর্ণরূপে ইসলামে প্রবেশ করো।’

সামাজিক স্থিতিশীলতা ও অগ্রগতি বজায় রাখতে দারিদ্র্য বিমোচন অত্যন্ত জরুরি। ইসলামে দারিদ্র্য দূরীকরণে সুনির্দিষ্ট কিছু দিকনির্দেশনা রয়েছে। এক্ষেত্রে আর্থিক সহযোগিতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম হলো জাকাত, যা মূলত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের একটি শক্তিশালী মাধ্যম। জাকাতের মাধ্যমে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত হয় এবং ধনী-দরিদ্রের মধ্যকার বৈষম্য হ্রাস পায়। পবিত্র কোরআনের সূরা জারিয়াতের ১৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তাদের সম্পদে রয়েছে প্রার্থনাকারী ও বঞ্চিতের অধিকার।’ রাসুলুল্লাহ (সা.)-ও হাদিসে উল্লেখ করেছেন যে, আল্লাহ ধনীদের সম্পদে জাকাত ফরজ করেছেন, যা ধনীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করে গরিবদের মধ্যে বিতরণ করতে হবে (সহিহ বুখারি, হাদিস ১৩৯৫)। হতদরিদ্র মানুষের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন আর্থিক সহযোগিতা। অনেক দরিদ্র ব্যক্তি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। সে বলল, এ বিষয়টি ছাড়া আমার আর কিছুই জানা নেই যে দুনিয়াতে আমি মানুষের সঙ্গে ব্যবসা করতাম, অর্থাৎ ঋণ দিতাম। দানের অর্থ দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি তাঁদের স্বাবলম্বী হয়ে উঠতেও সহায়তা করে।

ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিদের সহায়তা করাও ইসলামে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। কোনো ঋণগ্রহীতা অস্বচ্ছল হলে তার আর্থিক অবস্থা ভালো হওয়া পর্যন্ত অবকাশ দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে। সূরা তাওবার ৬০ নম্বর আয়াতে ঋণ পরিশোধে জাকাত ব্যবহারের বিধানও স্পষ্ট করা হয়েছে। এছাড়া, ঋণগ্রহীতাকে সময় দেওয়া বা ঋণ মওকুফ করার ফজিলত সম্পর্কে রাসুল (সা.)-এর একটি হাদিস রয়েছে, যেখানে এক ব্যক্তির জান্নাতে প্রবেশের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সে ব্যবসায় অস্বচ্ছল ব্যক্তিদের ঋণ পরিশোধে অবকাশ দিত এবং অভাবী হলে তা ক্ষমা করে দিত (সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৪৫১)। সূরা বাকারার ২৮০ নম্বর আয়াতে অসচ্ছল ঋণগ্রহীতাকে সময় দেওয়া এবং সম্ভব হলে সদকা করে দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এমনকি ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিকে ঋণ পরিশোধের জন্য জাকাত দেওয়ারও বিধান রয়েছে। (সুরা তাওবা, আয়াত: ৬০)। এসব নির্দেশনা অনুসরণ করলে সমাজকে দারিদ্র্যমুক্ত করা সম্ভব। আর যদি সদকা করে দাও, তবে তোমাদের পক্ষে সেটাই অধিকতর শ্রেয়, যদি তোমরা উপলব্ধি করো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৮০)। আরও বলেন, ‘তোমাদের পূর্ববর্তীদের মধ্যে এক ব্যক্তির কাছে ফেরেশতা তার প্রাণ হরণের জন্য এসেছিলেন। এ আমলের কারণে আল্লাহ–তাআলা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করালেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৪৫১)। এরপর তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, তুমি কি কোনো ভালো কাজ করেছ।

দারিদ্র্য নিরসনে দান-সদকা অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে। এটি কেবল অভাব মেটায় না, বরং মানুষকে স্বাবলম্বী করে তুলতে সহায়তা করে। তাই ইসলাম সাধারণ দান-সদকার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘প্রত্যেক মুসলিমের ওপর দান-সদকা করা একান্ত জরুরি’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস ১০০৮)।

জীবিকা নির্বাহের জন্য ব্যবসা একটি পবিত্র ও সম্মানজনক মাধ্যম। কঠোর পরিশ্রম ও সততা মানুষকে আর্থিক অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি দেয়। ব্যবসা কেবল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে না, বরং ব্যক্তিকে দক্ষ ও আত্মবিশ্বাসী হিসেবে গড়ে তোলে। সূরা জুমার ১০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, নামাজের পর জমিনে ছড়িয়ে পড়ে আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশ করতে এবং অধিকহারে আল্লাহর স্মরণ করতে, যাতে সফলতা অর্জিত হয়। আর বেশি বেশি আল্লাহকে স্মরণ করো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।’ (সুরা জুমা, আয়াত ১০)।

প্রতিবেদনটির লেখক মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী। তিনি বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এবং আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজমের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


আমাদের ফেসবুক পেইজ