সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৫৬ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
পিস্তল হাতে অভিযান: আইনের ব্যত্যয় হলে ব্যবস্থা নেবে ডিবি রাষ্ট্রপতি: অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোই দুর্গাপূজার দর্শন রাড্ডা হাসপাতাল ভাঙচুর: জড়িতদের গ্রেপ্তারে ৭ দিনের আলটিমেটাম গাজায় ধ্বংসস্তূপ থেকে ৭৫ ফিলিস্তিনির মৃত অবস্থায় পাওয়ার ঘটনায় গ্রামীণ কল্যাণের ৬৬৬ কোটি টাকা কর আদায়ে স্থগিতাদেশ ২৪ ঘণ্টায় হামে ৭ ও ডেঙ্গুতে ৪ জনের মৃত্যু শাহজালাল বিমানবন্দরে বাফুফে সভাপতি ও ফিফা প্রধানের সাক্ষাৎ মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: সৌদি রাষ্ট্রদূতকে তলব করল ঢাকা ইরানের নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে মেহেরদাদ আখলাকি কেতাবচির জয় নেত্রকোনায় সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান মৃত্যুর ঘটনা মামলায় গ্রেপ্তার এক যুবক

গরু নিয়ে রাজনীতির খেলা: বিপরীত মেরুর একই চিত্র

প্রতিবেদকের নাম

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামি ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের কিছু শিক্ষার্থী স্নাতক শেষ হওয়ার আয়োজনে গরুর মাংসের খিচুড়ি রান্নার উদ্যোগ নিলে তা নিয়ে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অভিযোগ ওঠে যে, তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী মন্দিরের কাছে রান্না করেছেন এবং রান্নার কাজে মন্দিরের ইট ব্যবহার করেছেন। যদিও আয়োজক শিক্ষার্থীরা দ্রুত ইট সরিয়ে নেন এবং নিজেদের অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সহায়তায় আলোচনার মাধ্যমে সমাধানও এসেছিল, তবুও বিষয়টি সেখানেই থেমে থাকেনি। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যেন ‘ঠুঁটো জগন্নাথ’ কথাটিই সার্থক করে তুলল। আবার মন্দিরের কাছে রান্না নিয়ে আপত্তি জানালেই কেউ অন্যের খাবার খাওয়ার স্বাধীনতা কেড়ে নিতে চান, এমনটা বলা যায় না। আপত্তির কারণ ও পরিস্থিতি বিবেচনা নিতে হবে। যাঁরা শুরুতে রান্না করেছিলেন, তাঁরা ভুল বুঝে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। ক্যাম্পাসে কোথায় পশু জবাই করা যাবে, কোথায় রান্না হবে, উপাসনাস্থলের পরিবেশ কীভাবে বজায় রাখা হবে—এসব আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করা যেত।

ঘটনাটি দ্রুত একটি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে রূপান্তর করা হয়। ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতৃত্বাধীন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) ক্যাম্পাসে গরু জবাই ও ভোজের ঘোষণা দেয়। প্রশাসন জনস্বাস্থ্য ও ক্যাম্পাসের পরিচ্ছন্নতার দোহাই দিয়ে পশু জবাইয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিলেও, পরে সেই অবস্থান থেকে সরে আসে এবং অনুমতি দেয়। শুক্রবার সেই কর্মসূচি পালনের পর শনিবার বাংলাদেশ খেলাফত ছাত্র মজলিসের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার পক্ষ থেকে পুনরায় গরু জবাই ও কাওয়ালি অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেওয়া হয়। প্রক্টরের ভাষ্য অনুযায়ী, চাপের মুখে শর্ত সাপেক্ষে সেই দ্বিতীয় আয়োজনটিরও অনুমতি দিতে হয়েছে প্রশাসনকে। এই ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নমনীয়তা ও অসহায়ত্বের এক স্পষ্ট প্রমাণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে নির্দেশনা নিজেরাই দিয়েছিল, সেটি কার্যকর করার বদলে চাপের মুখে তার ব্যাখ্যা বদলাতে হলো। তারপর রাজনৈতিক নেতার ফোনে মিলল আরেক আয়োজনের অনুমতি। প্রশ্নটি তখন খাবারের মধ্যে থাকে না; কার ইচ্ছায় ক্যাম্পাস চলবে, সেই ক্ষমতা প্রদর্শনের প্রশ্ন হয়ে ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্ব ছিল স্পষ্ট ও সমানভাবে প্রযোজ্য নিয়ম নির্ধারণ করা। এতে বিদ্বেষ ও বিভক্তি তৈরি করে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার পথ প্রশস্ত হয়; খাবার তখন উপলক্ষ; আসল বিষয় ক্ষমতা ও আধিপত্যের প্রদর্শন। নিজের ধর্মকে শ্রেষ্ঠ মনে করা ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয়।

গরু জবাই বা মাংস খাওয়ার অধিকারের চেয়ে এখানে আধিপত্য বিস্তারের বিষয়টি মুখ্য হয়ে উঠেছে। ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর থেকে বিভিন্ন স্থানে ‘জিয়াফত’ নামে এমন গরু জবাইয়ের কর্মসূচি লক্ষ্য করা গেছে। নভেম্বরে কার্যালয়ের সামনেও একইভাবে এমন কর্মসূচি পালন করা হয়, যা কেবল ভোজ ছিল না, ছিল সংবাদমাধ্যমের প্রতি একধরনের রাজনৈতিক বার্তা। এছাড়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সালাহউদ্দিন আম্মারের নেতৃত্বে ‘জুলাই জিয়াফত’ নামে গরু জবাইয়ের কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। এই আয়োজনগুলোকে নিরীহ প্রতিবাদ বা সামাজিক খাওয়াদাওয়া বলার সুযোগ নেই; বরং এগুলো প্রতিপক্ষকে চিহ্নিত করে রাজনৈতিক উত্তাপ তৈরির কৌশলে পরিণত হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ‘জিয়াফত’ নাম দিয়ে গরু জবাইয়ের কর্মসূচি আমরা আগেও দেখেছি। ২০২৪ সালের নভেম্বরে কার্যালয়ের সামনে এমন কর্মসূচি পালিত হয়েছিল। একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়েও একই প্রবণতা দেখা গেছে।

ভারতের প্রবীণ বাম নেতা বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য কয়েক বছর আগে প্রকাশ্যে গরুর মাংস খেয়ে সাম্প্রদায়িক অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতে তাঁর সেই অবস্থান ছিল ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের খাদ্যাভ্যাসে হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে এক সাহসী প্রতিবাদ। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে গরুর মাংস খাওয়ার ওপর কোনো রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক নিষেধাজ্ঞা নেই; বরং সবখানেই এটি সহজলভ্য। তারপরেও একদল রাজনৈতিক গোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাসকে ‘বিপন্ন অধিকার’ হিসেবে প্রচার করে ধর্মীয় আবেগকে উসকে দিচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে পরিবর্তন সাম্প্রদায়িক সম্পর্কে প্রভাব ফেলবে। একজন ব্রাক্ষণের গরুর মাংস খাওয়ার ঘটনাটি সেখানে বিতর্কের ঝড় তুলেছিল। বাজারে-সুপার শপে দেদার গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে। হোটেল, রেস্তোরাঁ, ক্যানটিনে প্রতিদিন গরুর মাংস খাওয়া হচ্ছে। গরুর মাংস খাওয়া নিয়ে কোথাও কোনো বাধা নেই; অল্প যেটুকু সংবেদনশীলতা আছে, সেটা অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি একধরনের সম্মান বা সহনশীলতা থেকে তৈরি হয়েছে।

একদিক থেকে দেখলে, ভারতের গোরক্ষক ও বাংলাদেশের এই গরু জবাইকারী গোষ্ঠীর রাজনীতির ধরন বিপরীত হলেও তাদের রাজনৈতিক কৌশলের মূল ভিত্তি একই। দুই পক্ষই সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মীয় আবেগ ও আধিপত্যকে ব্যবহার করে সংখ্যালঘুদের অস্বস্তিতে ফেলতে চায়। ভারতের গোরক্ষকেরা মাংস খেতে বাধা দিয়ে যা করে, বাংলাদেশে এই গোষ্ঠীগুলো ঠিক তার বিপরীত কাজটিই করছে।

সাম্প্রতিক সময়ে রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি দেওয়া, সাতক্ষীরায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা এবং দুর্গাপূজার সময় বিভিন্ন স্থানে গরু জবাইয়ের কর্মসূচিগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলোর মধ্য দিয়ে আমাদের সামাজিক মূল্যবোধের দ্রুত পরিবর্তন ও অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। অন্যের অধিকার ও সমান মর্যাদা খর্ব করে কেউ যদি নিজের মতবাদ চাপিয়ে দেয়, তবে তা কোনো সুস্থ রাজনীতির লক্ষণ হতে পারে না। প্রকৃত উদার গণতান্ত্রিক চর্চায় বিশ্বাসীদের সীমান্তের ওপারের বিভাজনের রাজনীতির মতোই নিজের দেশের এই অসহিষ্ণু রাজনৈতিক প্রবণতারও প্রতিবাদ করা উচিত। বিভাজনের রাজনীতি থেকে মানুষ মুখ ফেরাচ্ছে। কেউ যদি ভারতে হিন্দুত্ববাদীদের বিদ্বেষ ও বিভাজনের রাজনীতির সত্যিকারের বিরোধী হন, তাহলে তাঁকে বাংলাদেশে একই ধরনের রাজনীতিরও বিরোধিতা করতে হবে। কিন্তু এ ঘটনাগুলোর মধ্যে যে মিল লক্ষণীয় তা হলো: আমাদের সামাজিক–রাজনৈতিক মূল্যবোধ খুব দ্রুত পাল্টাচ্ছে, অসহিষ্ণুতা বাড়ছে এবং ভিন্নতা ও বৈচিত্র্যসহ সহাবস্থানের যে সংস্কৃতি ছিল, তা দারুণভাবে সংকুচিত হচ্ছে। মনজুরুল ইসলাম জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক *মতামত লেখকের নিজস্ব।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


আমাদের ফেসবুক পেইজ