পৃথিবীর মানচিত্র মানুষের ইচ্ছা ও শক্তির জোরে খণ্ডবিখণ্ড হয়েছে। ক্ষমতার দাপটে রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে জাতীয়তাবাদ তত্ত্বটি বিশ্বজুড়ে প্রভাব বিস্তার করেছে। জাতীয়তাবাদ মূলত একটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিশ্বাস, যা জাতি ও রাষ্ট্রের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের চেষ্টা করে। ফরাসি বিপ্লব ও নেপোলিয়ন যুগে ইউরোপে এই ধারণার উত্থান ঘটে, যা জার্মানি ও ইতালির মতো রাষ্ট্রকে ঐক্যবদ্ধ করার পাশাপাশি অস্ট্রো-হাঙ্গেরি ও অটোমান সাম্রাজ্যের মতো বহুজাতিক কাঠামো ভেঙে দিয়েছিল।
বাঙালি জাতিসত্তার বিকাশে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের প্রভাব অনস্বীকার্য। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখায় দেশমাতৃকার প্রতি ভক্তি ও আধ্যাত্মিক জাতীয়তাবাদের প্রতিফলন দেখা যায়, যা আনন্দমঠ উপন্যাস ও বন্দে মাতরম গানের মাধ্যমে স্বাধীনতা আন্দোলনের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। অন্যদিকে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উগ্র জাতীয়তাবাদকে মানবতার পরিপন্থী মনে করতেন এবং সংকীর্ণ জাত্যভিমান প্রত্যাখ্যান করে সর্বজনীন মানবতাবাদের ওপর জোর দিয়েছিলেন।
ভারতভাগের পর হিন্দু জাতীয়তাবাদের বিপরীতে মুসলিম জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়। তবে এই অখণ্ডতা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পশ্চিমের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের বৈষম্যের ক্ষোভ থেকেই মূলত বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি তৈরি হয়। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে ভাষা আন্দোলন (১৯৪৮-৫২) থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের সশস্ত্র প্রতিরোধযুদ্ধ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই এই জাতীয়তাবাদী চেতনা বিকশিত হয়েছে।
এই সময়ে তিনটি স্লোগান বাঙালিকে উজ্জীবিত করেছিল: ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা’, ‘তুমি কে আমি কে, বাঙালি বাঙালি’ এবং ‘জয় বাংলা’। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান নামে পরিচিত ভূখণ্ডটি স্বাধীন বাংলাদেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তবে স্বাধীনতার এত বছর পরও জাতীয়তাবাদের সংজ্ঞা নিয়ে বিতর্ক রয়ে গেছে। ১৯৭২ সালের সংবিধানে বাঙালি পরিচয়কে জাতিসত্তার ভিত্তি করা হলেও, বাংলাদেশের বাইরেও কোটি কোটি বাংলাভাষী মানুষ অন্য রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে বসবাস করছেন।
রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের ক্ষেত্রে ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং রাষ্ট্রভিত্তিক বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। আওয়ামী লীগ বাঙালি জাতীয়তাবাদকে মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার হিসেবে তুলে ধরে, অন্যদিকে বিএনপি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে রাষ্ট্রভিত্তিক নাগরিক পরিচয়ের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে। এই রাজনৈতিক বিভাজন শুধু সাংস্কৃতিক নয়, বরং রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণেও বড় প্রভাব ফেলেছে।
শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে আওয়ামী লীগের ‘জাতির পিতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করার বিষয়টিও এই বিতর্কের অংশ। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি হিসেবে তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য হলেও, হাজার বছরের পুরনো বাঙালি জাতিসত্তার প্রেক্ষাপটে এই পিতৃতান্ত্রিক ধারণা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর যে ভূমিকা ছিল, বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনের ক্ষেত্রে শেখ মুজিবুর রহমান সেই একই রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করেছেন।
আমাদের রাষ্ট্রের এই ভৌগোলিক সীমানা কিন্তু মুজিব বা জিন্নাহ—কেউই তৈরি করেননি। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক নিয়োজিত পাঞ্জাব ও বাংলা বাউন্ডারি কমিশনের প্রধান স্যার সিরিল জন র্যাডক্লিফের কলমের আঁচড়েই এই ভূখণ্ডের সীমানা নির্ধারিত হয়েছিল। ৫৫ বছর ধরে আমরা এই জাতীয় পরিচয় ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে বিতর্ক বা ‘কাইজ্জা’ করে যাচ্ছি, যা শেষ পর্যন্ত আমাদের জাতিসত্তার সংকটকেই সামনে নিয়ে আসে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: যার যত বেশি ক্ষমতা, সে তত বেশি ছড়ি ঘোরায়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এর মধ্য থেকেই উঠে এসেছে নানান তত্ত্ব। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এই তত্ত্বের জোরে রাষ্ট্র তৈরি হয়, টিকে থাকে কিংবা ভাঙে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এটি মানুষকে এককাট্টা করতে পারে, আবার উগ্র রূপে বিভেদও তৈরি করতে পারে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদ আধুনিক জাতি-রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে আর বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদ স্বাধীনতাসংগ্রামে ঐক্য এনেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্রকৃতপক্ষে ইউরোপ আর বাংলাদেশের মধ্যে পার্থক্য সামান্যই।