চট্টগ্রামের রাউজান একসময় ‘সন্ত্রাসের জনপদ’ হিসেবে পরিচিত থাকলেও, বর্তমানে অপরাধ কর্মকাণ্ডের দিক থেকে সীতাকুণ্ড উপজেলা সেই অবস্থানকে ছাড়িয়ে গেছে। গত দুই বছরে রাউজানে ৩৪ জন নিহত হওয়ার বিপরীতে, একই সময়ে সীতাকুণ্ডে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৫-এ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত এই ৪৫টি হত্যাকাণ্ডের তথ্য পাওয়া গেছে, যার মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে ৩৮ জন এবং বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে সাতজন প্রাণ হারিয়েছেন।
এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মোট ৪১টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, পাঁচ শতাধিক আসামির মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ৪৮ জনকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের বড় একটি অংশ জামিনে রয়েছেন। এছাড়া চারটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় স্বজনরা কোনো মামলা করেননি। সীতাকুণ্ড মডেল থানার তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে ৩৪টি হত্যা মামলার মধ্যে সাতটির তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হয়েছে এবং ২৭টি মামলা এখনো তদন্তাধীন।
গত ১৯ জানুয়ারি সলিমপুরে র্যাবের ডিডি মোতালেব হত্যার ঘটনাটি প্রশাসনের কাছে অত্যন্ত গুরুত্ব পেয়েছে। এই মামলায় এজাহারভুক্ত ২৯ জন এবং অজ্ঞাতনামা দেড় শতাধিক আসামি রয়েছেন। এ পর্যন্ত এজাহারভুক্ত পাঁচজনসহ মোট ২০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া সীতাকুণ্ডে গত দুই বছরে ২৫টি ধর্ষণের মামলা হয়েছে, যার মধ্যে ১৭টি অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে এবং আটটি বিএনপি সরকার গঠনের পর হয়েছে। একই সময়ে অপহরণের ২০টি মামলাও নথিভুক্ত হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৫টি ঘটনা রাজনৈতিক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এছাড়া ১৫ জন পূর্বশত্রুতা ও সম্পত্তির বিরোধে, পাঁচ নারী পারিবারিক কলহে, চারজন গণপিটুনিতে এবং দুজন ধর্ষণচেষ্টার পর নিহত হয়েছেন। চারটি হত্যার কারণ এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডগুলোর পেছনে আদর্শিক বিরোধের চেয়ে এলাকা নিয়ন্ত্রণ, দলীয় আধিপত্য এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণই প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
রাজনৈতিক পালাবদলের পরও সীতাকুণ্ডে হত্যার ঘটনায় উভয় দলের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততা দেখা গেছে। নিহত ১৫ জনের মধ্যে বিএনপির আটজন এবং আওয়ামী লীগের সাতজন রয়েছেন। বাড়বকুণ্ডে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক নাছির উদ্দিন নিজ দলের প্রতিপক্ষের হাতে খুন হয়েছেন। অন্যদিকে, মুরাদপুরে আওয়ামী লীগ নেতা শামীমকে পিটিয়ে ও রগ কেটে হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া যুবলীগ নেতা মুসলিম ও ইউসুফ বেলাল অর্ণব এবং কৃষক লীগের আহ্বায়ক মীর ইউসুফকেও হত্যার শিকার হতে হয়েছে।
জমি ও সম্পত্তির বিরোধের পাশাপাশি বালু উত্তোলন, ইট ও কংক্রিটের ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়েও সংঘাত বাড়ছে। বাড়বকুণ্ডে সত্তরোর্ধ্ব নাবীউল হককে বাড়ির সীমানা নিয়ে বিরোধের জেরে ইট দিয়ে থেঁতলে হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া বিক্রয়কর্মী নয়ন দেবনাথের কাছে চাঁদা দাবি করে দেড় লাখ টাকা ও স্বর্ণ নেওয়ার পরও তাকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়।
সীতাকুণ্ডের শিল্পমালিকরা চাঁদাবাজি ও আধিপত্য নিয়ে চরম আতঙ্কে রয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কারখানার মালিক জানিয়েছেন, আগে একটি পক্ষ চাঁদা নিলেও এখন একাধিক পক্ষের চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে। সীতাকুণ্ডের ভৌগোলিক অবস্থান, বিশেষ করে জঙ্গল সলিমপুরের পাহাড়ি এলাকা অপরাধীদের আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় তা নিয়ন্ত্রণে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ডা. কমল কদর জানিয়েছেন, দলীয় নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার ঘটনায় তদন্ত সাপেক্ষে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং আহতদের চিকিৎসায় সহায়তা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, সীতাকুণ্ডে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পাহাড়ি এলাকার ভৌগোলিক সুযোগ অপরাধীদের আস্তানা গড়ার সুযোগ করে দিয়েছিল। তবে প্রশাসনের কঠোর অবস্থানে এখন পরিস্থিতির পরিবর্তন আসছে এবং অন্যান্য অপরাধও ক্রমান্বয়ে কমে আসবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
আইনি প্রক্রিয়ার ধীরগতি ও মামলার তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষোভ রয়েছে। থানার তথ্য অনুযায়ী, নাম উল্লেখ করে আসামি করা হয়েছে ২৪৩ জনকে এবং ছয়টি মামলায় অজ্ঞাতনামা আসামির সংখ্যা আড়াই শতাধিক। এত বিপুলসংখ্যক আসামির বিপরীতে গ্রেপ্তারের হার মাত্র ১০ শতাংশের কাছাকাছি। এখন পর্যন্ত মাত্র একটি মামলায় আদালতের রায় হয়েছে, যেখানে আট বছরের শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার পর হত্যার দায়ে বাবু শেখকে মৃত্যুদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
সীতাকুণ্ড দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বাণিজ্যিক করিডোর। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, চট্টগ্রাম বন্দর ও শতাধিক ভারী শিল্পকারখানার উপস্থিতির কারণে এই এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য। স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত পদক্ষেপের ওপরই এখন এই এলাকার শান্তি ও শৃঙ্খলা নির্ভর করছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: জমির বিরোধে মোহাম্মদ সুমন (৩৮) নামে এক ব্যক্তির ওপর হামলা হলে পরে হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সর্বশেষ গত ২৫ আগস্ট মুরাদপুর ইউনিয়নে নুরুল ইসলাম ইরান নামে এক ব্যক্তিকে কুপিয়ে ও গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে এ সংখ্যা ছিল ১৭। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ ঘটনায় সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও তাদের বেশির ভাগই জামিনে আছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: নিহতের স্ত্রী মোমেনা বেগমের অভিযোগ, মামলা করার পর দলীয় নেতাদের চাপে তাকে আসামিদের বিষয়ে আদালতে অনাপত্তি দিতে বাধ্য করা হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগরের পাহাড়ি এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেও সংঘর্ষে প্রাণহানি ঘটেছে।