বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৪২ অপরাহ্ন

চলতি ডিসেম্বরের মধ্যেই পুরোপুরি ডিজিটাল চট্টগ্রাম বন্দর

প্রতিবেদকের নাম

দেশের সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দরকে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে শতভাগ ডিজিটাল ও স্মার্ট বন্দরে রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক)। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো বন্দরের সামগ্রিক কার্যক্রমকে পুরোপুরি কাগজবিহীন করা, পরিচালন ব্যয় হ্রাস করা, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং বন্দরের প্রবেশপথের যানজট নিরসন করা। বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানের সভাপতিত্বে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত একটি অগ্রগতি পর্যালোচনা সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় ম্যানুয়াল কার্যক্রম বন্ধ করে বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মধ্যে সমন্বয় সাধনের ওপর জোর দেওয়া হয়।

২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতার এক বিশাল চিত্র পাওয়া যায়। এ বছর বন্দরটি ৩৪ লাখ টিইইউ কনটেইনার, ১৩ কোটি ৮০ লাখ টন সাধারণ পণ্য এবং ৪ হাজার ২৭৩টি জাহাজ সফলভাবে হ্যান্ডলিং করেছে। দেশের সমুদ্রপথে পরিবাহিত সাধারণ পণ্যের ৯২ শতাংশ এবং কনটেইনার বাণিজ্যের ৯৮ শতাংশ এই বন্দরের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়। বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামীম জানান, আমদানিকারক, রপ্তানিকারক, শিপিং লাইন, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, ব্যাংক ও কাস্টমসের মতো সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর জটিল কার্যক্রমকে নিরবচ্ছিন্ন রাখতে বিচ্ছিন্ন অনলাইন সেবার পরিবর্তে একটি সমন্বিত ডিজিটাল সিস্টেম গড়ে তোলা হচ্ছে। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দর রেকর্ড পরিমাণ ৩৪ লাখ টিইইউ (২০ ফুট দীর্ঘ) কনটেইনার, ১৩ কোটি ৮০ লাখ টন সাধারণ পণ্য এবং ৪ হাজার ২৭৩টি জাহাজ হ্যান্ডলিং করেছে।

নতুন এই অটোমেশন প্রক্রিয়ায় বন্দরের প্রতিটি স্তর যুক্ত করা হচ্ছে। বর্তমানে জাহাজের বিল পরিশোধ প্রক্রিয়া শতভাগ অনলাইনে সম্পন্ন হচ্ছে। এছাড়া সোনালী ব্যাংক পিএলসির সঙ্গে নতুন ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সেন্টারের মাধ্যমে এপিআই সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে, যার ফলে কনটেইনার ও কনসাইনি বিলিং ব্যবস্থা টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেমের (টিওএস) সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। এর ফলে আমদানিকারকরা ছুটির দিনসহ যে কোনো সময় অর্থ পরিশোধ করতে পারবেন। এছাড়া পাওনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে আদায়ের জন্য একটি ‘অটো-পুল পেমেন্ট সিস্টেম’ও চালু করা হবে, যেখানে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে বিল পরিশোধ না করলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হবে। তিনি বলেন, নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে বন্দরের কার্যক্রমের প্রতিটি স্তরে ডিজিটাল অটোমেশনের পরিধি বাড়ানো হবে। ইতোমধ্যে জাহাজের বিলের ১০০ শতাংশ অনলাইনে প্রক্রিয়াকরণ করা হচ্ছে। সূত্র জানায়, আমদানিকারক ও তাদের মনোনীত অভ্যন্তরীণ সেবাদানকারী এজেন্টরা সাপ্তাহিক ছুটির দিন ও সরকারি ছুটির দিনসহ সার্বক্ষণিক অর্থ পরিশোধ করতে পারবেন।

গত জুলাই মাসে এনবিআর-এর অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমের সঙ্গে টিওএস-এর সমন্বয়ের মাধ্যমে ডেলিভারি অর্ডারের ডিজিটালাইজেশন করা হয়েছে। এতে কোনো প্রকার নথিপত্র ছাড়াই আমদানিকারকরা অনলাইনে কার্যক্রমের অগ্রগতি জানতে পারছেন। পাশাপাশি যানবাহনের দীর্ঘ সারি কমাতে ‘টাইম স্লট ম্যানেজমেন্ট’, অনলাইন কার্ট টিকিট এবং ই-গেট পাস প্রবর্তনের কাজ চলছে। ইকুইপমেন্ট ইন্টারচেঞ্জ রিসিপ্টকে ই-গেট পাসের সঙ্গে সমন্বয় করায় ট্রাকের প্রবেশ ও পণ্য পরিবহনের পুরো প্রক্রিয়াটি সময়সূচির আওতায় আসবে। এর ফলে ট্রাক প্রবেশ, পণ্য বোঝাই ও বের হওয়ার সময়সূচি পূর্বনির্ধারিত ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় পরিচালিত হবে।

কাস্টমসের নিলাম কার্যক্রম, বিশেষ ডেলিভারি এবং আইসিডি’র কার্যক্রমগুলোও এনবিআর ও কাস্টমসের এপিআই-এর মাধ্যমে সমন্বিত করা হচ্ছে, যা অংশীদারদের মধ্যে তাৎক্ষণিক তথ্য আদান-প্রদান সহজ করবে। এমনকি বাল্ক পণ্য হ্যান্ডলিংয়েও ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। নির্মাণাধীন বে-টার্মিনালে যানবাহনের শৃঙ্খলা ফেরাতে স্লটভিত্তিক ডিজিটাল পার্কিং টিকিটের ব্যবস্থাও রাখা হবে।

ডিজিটাল রূপান্তরের এই অবকাঠামো আগে থেকেই প্রস্তুত রয়েছে বলে জানান বন্দর কর্তৃপক্ষ। চলতি বছরের শুরুতে ‘পোর্ট সিঙ্গেল উইন্ডো-সিপিএ স্কাই’ প্ল্যাটফর্ম চালুর মাধ্যমে একক লগইনে বিভিন্ন সেবা পাওয়ার সুবিধা তৈরি করা হয়েছে, যা ডিজিটাল রাডারের মাধ্যমে জাহাজের গতিবিধি পর্যবেক্ষণে সহায়তা করছে। বর্তমানে টিওএস ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে মাসে ৬০ থেকে ৬৫ হাজার গেট প্রবেশ পরিচালনা করা হচ্ছে এবং একদিনে সর্বোচ্চ ৭ হাজার ৮০টি গেট পাস ইস্যুর রেকর্ডও রয়েছে। এই সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হলে বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুযায়ী চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রমে আরও গতিশীলতা আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে পণ্য খালাসে সময় কমানো, রাজস্ব আদায় ত্বরান্বিত করা এবং বন্দরের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় গতি আনার পাশাপাশি উন্নত বিশ্বের বন্দরগুলোর মতো স্বয়ংক্রিয় ও প্রযুক্তিনির্ভর সমুদ্রপথের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য কার্যক্রমের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চট্টগ্রাম বন্দরের।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


আমাদের ফেসবুক পেইজ